বিদ্যুত্সংযোগ

থাকলেই নিতে হবে টিআইএন

আপডেট : ১৪ জুন ২০১৯, ২২:৪১

পরিষেবা হিসেবে যার নামেই বিদ্যুত্সংযোগ থাকবে— তাকেই কর শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন নিতে হবে। শুরুতে ঢাকাসহ দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকার বিদ্যুত্ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এটি চালু হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিলে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নতুন করে কয়েক লাখ মানুষকে করের আওতায় আনতে চায় কর বিভাগ। আগে কেবল বাণিজ্যিক বিদ্যুত্সংযোগের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক ছিল। সিটি করপোরেশন এলাকার পর এই উদ্যোগ জেলা পর্যায়েও বিস্তৃত করার লক্ষ্য রয়েছে। বিদ্যুত্ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এ কাজটি তদারক করবে আয়কর বিভাগ। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন এলাকাসহ দেশের সব পৌরসভা এলাকায় ১ লাখ টাকার ওপরে জমি বিক্রি করতে হলে ক্রেতার পাশাপাশি বিক্রেতারও টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জমির দলিলের সঙ্গে ওই টিআইএন নম্বরও উল্লেখ করতে হবে। এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশিদের কাছ থেকে কোনো অর্থছাড় করতেও টিআইএন প্রয়োজন হবে। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে নতুন করে করের আওতায় আনতে চায় সরকার। করদাতার সংখ্যা বাড়াতে দেশের সব উপজেলায় কর অফিস স্থাপনের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া করদাতা খুঁজতে গোয়েন্দা ইউনিটও গঠন করা হবে।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে যাদের বিদ্যুত্সংযোগ রয়েছে, তাদের টিআইএন নিতে হবে। আর নতুন সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে। বিদ্যুত্ বিতরণকারী সংস্থাগুলো এর দেখভাল করবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের হয়রানির সুযোগ বাড়বে।  সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ইত্তেফাককে বলেন, কর বিভাগ নিজের কাজ করতে পারে না। অন্যের ঘাড়ে দিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করতে চায়। অনেক গরিব মানুষ আছে, যাদের কোনো করযোগ্য আয়ই নেই। বস্তিতে বসবাসকারী মানুষেরও বিদ্যুত্ সংযোগ নিতে হয়। কর ব্যবস্থার মূল নীতিই সহজীকরণ করা, অকারণে ঝামেলা করা নয়। কিন্তু রাজস্ব বিভাগের এটি উদ্ভট চিন্তা। এটি বাস্তবায়ন করা হলে সাধারণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের কর কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়রানির সুযোগ তৈরি হবে।

বর্তমানে বাণিজ্যিক বিদ্যুত্ গ্রাহকদের টিআইএন বাধ্যতামূলক। নতুন এ সিদ্ধান্তের ফলে আবাসিকের গ্রাহককেও টিআইএন নিতে হবে। কেবল ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ মিলিয়ে ২২ লাখ বিদ্যুত্সংযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ডিপিডিসির গ্রাহকসংখ্যা ১৩ লাখ। ডেসকোর ৯ লাখ। অন্যান্য সিটি করপোরেশন হিসাব করলে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। এসব গ্রাহকের একটি অংশ অবশ্য এখন করের আওতায় রয়েছেন। আর দেশে ৩ কোটি ৩৪ লাখ বিদ্যুতের গ্রাহক রয়েছে।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিদ্যুত্ গ্রাহকদের টিআইএনের বাধ্যবাধকতায় আনা গেলে সরকারের ১ কোটি করদাতা তৈরির লক্ষ্যমাত্রার বেশিরভাগই পূরণ করা সম্ভব হবে।

বর্তমানে দেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা ৪০ লাখের কিছু বেশি। এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করেন ২০ লাখের কাছাকাছি। বাজেট বক্তৃতায় করদাতা ১ কোটিতে উন্নীত করার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

বর্তমানে ৩১ ধরনের ব্যবসা ও সেবায় টিআইএন বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে ১৬ হাজার টাকার ওপরে মাসিক বেতন হলে, সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করতে, মোবাইল ফোন রিচার্জ ব্যবসা, মোবাইল ব্যাংকিং, পরিবেশক এজেন্সি, বিভিন্ন ধরনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, ক্যাটারিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জনবল সরবরাহ ও সিকিউরিটি সার্ভিস, এমনকি আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা, পরিবেশক বা এজেন্ট নিয়োগ দানকারী প্রতিষ্ঠান, সিকিউরিটি সার্ভিস প্রতিষ্ঠানকে টিআইএন নিতে হয়। এ ছাড়া ঋণপত্র স্থাপন, রপ্তানি নিবন্ধন সনদ নেওয়া, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বা পুনর্নিবন্ধন, দরপত্র জমা, অভিজাত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ, বিমা জরিপ প্রতিষ্ঠান, জমি, ভবন ও ফ্ল্যাট নিবন্ধন, মোটরসাইকেল-বাস-ট্রাকের মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস নবায়ন, চিকিত্সক, প্রকৌশলী, হিসাববিদসহ বিভিন্ন ধরনের পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য, কোম্পানির পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডার, বিবাহ নিবন্ধনকারী বা কাজি, ড্রাগ লাইসেন্সধারী। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হলে, ভবন নকশা অনুমোদনে, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিলে, ক্রেডিট কার্ড থাকলে, বাণিজ্যিক গ্যাস ও বিদ্যুত্সংযোগ চাইলেও টিআইএন থাকতে হবে।