শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শত্রুকে ফাঁসাতে টাকার বিনিময়ে ধর্ষণের নাটক তরুণীর

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ১৮:১৭

তরুণীকে কাশবনে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের যে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গিয়েছিল গত ১৬ অক্টোবর। সেই ঘটনার নতুন মোড় নিয়েছে রাজধানীর ডেমরা থানাধীন এলাকায়। তরুণী অভিযোগ করে বলেছিলেন, চাচাতো ভগ্নিপতির সঙ্গে বেড়াতে গেলে কোমল পানীয়ের সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে তাকে ডেমরার কোনাপাড়ায় ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত এলাকার একটি কাশবনে নিয়ে ধর্ষণ করে একটি সংঘবন্ধচক্র। ঘটনার পর রাত ২টার দিকে ডেমরার পাইটি এলাকার রাস্তা থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেয় স্থানীয়রা।

ইত্তেফাক অনলাইনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। জানা গেছে, ওই তরুণী সংঘবন্ধ ধর্ষণের শিকার হননি। কথিত প্রেমিকের প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তিনি ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাজধানীর শনির আখড়ার একটি বাসায় স্বেচ্ছায় ৪ যুবকের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন।

কোকাকোলার সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে কাশবনে নিয়ে সংঘবন্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে বলে নাটক সাজানো হয়। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে শেষ পর্যন্ত তরুণী স্বীকার করেছেন ধর্ষণকাণ্ড সাজানোর কথা। তিনি জানিয়েছেন, এ নাটকের আদ্যোপান্ত ও নেপথ্যের কুশীলবদের নাম।

তার দেওয়া তথ্য মতে, মো. জামাল উদ্দিন সরকার ও মো. মিরাজ হোসেন নামে দুজন তাকে টাকা দিয়ে ভয়ঙ্কর এ নাটক সাজিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত দুজনের মধ্যে জামালকে গত ২৭ অক্টোবর রাতে যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ার গোবিন্দপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জামাল এখন কারাগারে। তবে বুধবার (২ নভেম্বর) রাতে ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী মিরাজকে গ্রেফতার করা হয়।

এদিকে সংঘবন্ধ ধর্ষণের স্বীকার বলে অভিযোগ করা সেই তরুণী বর্তমানে পুলিশি নজরদারিতে আছেন।

আটক মিরাজ ও জামাল

ঘটনার পারিপার্শ্বিক চিত্র বলছে, সংঘবন্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলার বাদি ওই তরুণীই উল্টো আসামি হয়ে যেতে পারেন। ঘটনার দিন ভুক্তভোগী তরুণীর বড় ভাই ইত্তেফাক অনলাইনকে জানান, তার বোনের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরের শিবচরে। ১৫ দিন আগে তার বোন বড় ভাইয়ের বাসা কদমতলীতে বেড়াতে যান। সেখান থেকে ঘটনার দিনগত বিকেলে ডেমরা থানার কোনাপাড়ার ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত এলাকার মেলায় যান। মেলায় চাচাতো ভগ্নিপতি সেলিম ও তার বন্ধু আলমের সঙ্গে ওই তরুণীর দেখা হয়। পরে তারা তাকে মেলায় বিভিন্ন ধরনের খাবার খাওয়ায়। সে সময় কোকাকোলার সঙ্গে নেশাজাতীয় কিছু একটা খাইয়ে অচেতন করে সিএনজিতে কোনাপাড়া কাশবনে নিয়ে তাকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে। স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে রাতে ডেমরা থানার টহল পুলিশ তাকে উদ্ধারের পর বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।

অনুসন্ধান বলছে, গত ১৬ অক্টোবর ঘটনার সময় তরুণীর অবস্থান কোনাপাড়া এলাকায় নয়; ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানাধীন শনির আখড়া এলাকায়। ওই এলাকাতেই জনৈক সেলিম ও আলমকে ধর্ষণের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করেন জামাল ও মিরাজ। পরিকল্পনা অনুযায়ী মিরাজ তার এই কথিত প্রেমিকাকে (তরুণী) ঠিক করেন। ঘটনার আগের দিন জামাল ও মিরাজ মিথ্যা ধর্ষণ মামলা সাজাতে ভিকটিম তরুণীকে ২০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থাৎ ১৬ অক্টোবর দিনভর ভিকটিমকে গোবিন্দপুর শনির আখড়া এলাকার একটি বাসায় আটকে রেখে অচেনা আরও ৪ জন যুবককে দিয়ে সংঘবন্ধ ধর্ষণ করায় অভিযুক্তরা। এরপর তরুণীকে কোকাকোলার সঙ্গে নেশাজাতীয় দ্রব্য পান করিয়ে অচেতন করেন তারা। ওই অবস্থায় রাতের আঁধারে ডেমরা থানাধীন পাইটি বার্জার পেইন্টস সেলস সেন্টারের সামনে পাকা রাস্তার ওপর ফেলে রেখে যায় অভিযুক্তরা। সেখান থেকে তরুণীকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করে পুলিশ। অভিযুক্তরা তরুণীদের ব্যবহার করে মিথ্যা মামলা সাজানোর ভয়ঙ্কর চক্র বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডেমরা থানার ওসি শফিকুর রহমান ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, তরুণীকে সংঘবন্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালত তার রিমান্ড মঞ্জুর করেননি। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে সংঘবন্ধ ধর্ষণ করিয়ে ওই তরুণীকে দিয়ে ‘সাজানো নাটক’ প্রসঙ্গে তদন্তাধীন বিষয় বলে তিনি মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইত্তেফাক/পিও