সংবিধানের ৫০ বছর পূর্তিতে দিনব্যাপী আলোচনা সভা

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২২, ২২:৫৩

গত ৫০ বছরে রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থে সংবিধানের পরিবর্তন করা হয়েছে। কারণে-অকারণে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে। কিন্তু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা আজও সম্ভব হয়নি। দেশের সর্বস্তরের জনগণের জন্য মৌলিক অধিকার আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে একটি ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। তাই সময় এসেছে সংবিধান মানুষের মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পারছে তা পর্যালোচনা করার।

শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে এ সভার প্রথম অধিবেশনের বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ বছর: অতীত ও বর্তমান’। বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. কাজী জাহেদ ইকবাল।

এতে সভাপতিত্ব করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। আলোচনায় অংশ নেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক, দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন ও আইআইডি-এর সিইও সাইদ আহমেদ।

বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, ‘জনগণের অধিকার রক্ষার নামে সংবিধানকে আমরা অনেকবার ক্ষত-বিক্ষত করেছি। এই সংবিধানের সংশোধন কোন সময় বাস্তব প্রয়োজনে হয়েছে আবার কখনো হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কারণে। আমরা কারণে-অকারণে সংবিধানের রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছি।’

বক্তব্য রাখছেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ। ছবি: ইত্তেফাক

তিনি বলেন, ‘আমরা যারা বুদ্ধিজীবী, আমরা যারা সংসদে গেছি. আমরা যারা বিচার বিভাগে ছিলাম তারা সংবিধানের এই রক্তক্ষরণের জন্য দায়ী, ক্ষত-বিক্ষত করার জন্য দায়ী। এই সংবিধানে আজকে যে রক্তক্ষরণ চলছে তা নিরাময়ের দায়িত্বও আমাদেরকেই নিতে হবে।’

বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, ‘সংবিধানের অভিভাবক হচ্ছে সুপ্রিমকোর্ট। সুপ্রিমকোর্ট সত্যিকারের অভিভাবক সেদিনই হবে যেদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা পূরণ না করে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে পারবে। কাগজেপত্রে যতই থাকুক যতক্ষণ একজন বিচারক নিজেকে স্বাধীন মনে করতে না শিখবেন ততদিন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আসবে না। তাই স্বাধীন মানসিকতা গড়ে তুলতে সুপ্রিমকোর্ট এবং সেখানে বিচারপতিরা সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে কাজ করবেন। কোন সরকারের অভিভাবক হিসেবে নয়, কোন ব্যক্তিবিশেষের মনস্কামনা পূরণ করার জন্য নয়।’

তাসমিমা হোসেন বলেন, সংবিধানের ৫০ বছর পূর্তিকালে মানুষের মৌলিক অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পারছে এ আলোচনায় তার মূল্যায়ন করছি। রাষ্ট্রের আরেকটি স্তম্ভ সংবাদপত্র স্বাধীন আছে কি না সেই প্রশ্নও আমরা করছি। আজ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এসে কী আবার সেই মধ্যযুগের রাজা-বাদশার আমলে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে-এমন প্রশ্নও উঠছে অনেকের মনে।

ইত্তেফাক সম্পাদক বলেন, ‘আমরা জানি, যে বিধানে রাষ্ট্রের সকলের প্রতি লক্ষ্য রাখা হয় সেটাই সত্যিকারের সংবিধান। তাই সংবিধান করলেই হবে না, অধিকার প্রতিষ্ঠাও করতে হবে।’

বক্তব্য রাখছেন ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। ছবি: ইত্তেফাক

তাসমিমা হোসেন বঙ্গবন্ধুর লেখার উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। বলেন, ‘শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকার থাকবে, অধিকারের পাশাপাশি তার কর্তব্য থাকবে। দেশে ফ্রি স্টাইল ডেমোক্রেসি চলতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের জানতে হবে, পড়তে হবে। শুধু ভোট দিয়েই নাগরিক দায়িত্ব পালন শেষ হয়ে যায় না। না পড়লে আমরা অধিকার সম্পর্কেও জানতে পারবো না। সেজন্য আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে সংবিধান ও মানুষের অধিকার প্রসঙ্গ তুলে আনতে হবে। তাদের শিক্ষিত ও অধিকার সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। এটা করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, তাদের সুন্দর জীবনের জন্য। সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধস্নাত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে এত রকমের বৈপরীত্য রয়েছে যে তা ‘অসীম অযৌক্তিকতা’ এর (absurd infinity) পর্যায়ে পড়ে। সংবিধান হচ্ছে পুরোপুরি একটি রাজনৈতিক আইন। অতএব, এর বিশ্লেষণে রাজনৈতিক প্রতিফলন আসতে বাধ্য। এটা দোষের কিছু নয়। তিনি আলোচনায় সংবিধানের নানা বৈপরীত্য তুলে ধরেন।

বলেন, সংবিধানে আছে, ‘চতুর্থ সংশোধনী কার্যকর হইবার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইয়াছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হইবে।’ আরেকটা কথা লেখা আছে, যা বর্তমান সরকারের কাজে লেগে যেতে পারে। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বলা হচ্ছে যা চতুর্থ সংশোধনীর পরের ধারাতে রয়েছে, বিদ্যমান সংসদের মেয়াদ আজকে থেকে পাঁচ বছর হইবে। সুতরাং এখন সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলেই তো হয়। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি যে, আমরা তো আগে একবার সংসদের মেয়াদ বাড়িয়েছি।

বক্তব্য রাখছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহ্দীন মালিক। ছবি: ইত্তেফাক

শাহ্দীন মালিক বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীতে যা লেখা রয়েছে তা সহজভাবে বললে বলতে হয়, জোর করে সংবিধান বিলুপ্ত করে বা সংবিধান স্থগিত করে কেউ যদি ক্ষমতা দখল করে তাহলে সেটা হবে দেশদ্রোহিতা। আর অন্য কোন আইনে সর্বোচ্চ যে শাস্তিটা আছে সেটা হবে দেশদ্রোহিতার শাস্তি। শাস্তির বিষয়টি পরিষ্কার না করে সংবিধানে এমন ‘অযৌক্তিক’ কথাও লেখা আছে।’

সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘সংবিধানে মৌলিক অধিকার রক্ষা কখনো রহিত হয়েছে, কখনো ক্ষুণ্ন হয়েছে, কখনো আপোস হয়েছে অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। কখনো সংবিধান অপারগ হয়েছে অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে। আবার কখনো সংবিধান সাংঘর্ষিক হয়েছে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায়।

আলোচনা সভায় বক্তরা। ছবি: ইত্তেফাক

’এরপর দ্বিতীয় অধিবেশনে ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ন্যায্যতার ধারণা: একটি রল্সীয় বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমেদ জাভেদ। আলোচনায় অংশ নেন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মির্জা এম হাসান ও  ব্র্যাক এর জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডায়ভার্সিটি বিভাগের পরিচালক নবনীতা চৌধুরী।

পরে ‘সংবিধান, সমতা ও বৈষম্যহীন সমাজের অঙ্গীকার’ বিষয়ে প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিচারপতি নাইমা হায়দার, অ্যাডভাকেট সারা হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন, ওয়ারদা আশরাফ, বনানী বিশ্বাস ও এ আইইউবি-এর সহকারী অধ্যাপক কাজী ওমর ফয়সাল।

ইত্তেফাক/এএএম