শনিবার, ০৩ জুন ২০২৩, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

কষ্টের ফেরীঅলার কষ্ট নেবে কে? 

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২, ২২:৪৯

‘কষ্ট নেবে কষ্ট/ হরেক রকম কষ্ট আছে/ লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট/ পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট/ আলোর মাঝে কালোর কষ্ট/ ‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে/ কষ্ট নেবে কষ্ট’। এভাবে বাংলা কবিতায় পাঠককে কষ্ট বিলি করতে চেয়েছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। কিন্তু কাব্য কল্পনার রঙ আর জীবনের বাস্তবতা যেনো তার জীবনে একাকার। জীবন জুড়ে তার কষ্টের হাহাকার। যৌবনের সেই কষ্টের ফেরীঅলা শেষ জীবনের সেই কষ্টের ক্রেতা হয়ে উঠেছেন!

হেলাল হাফিজ কোথায়? এমন প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে ঢাকার সাহিত্য সমাজে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলা কবিতার এই চিরসবুজ কবির আজ থাকার মতো বাসস্থান নেই! দেখার মতো নেই কোনো আপনজন! বহু আগেই স্বজন-পরিবার ছেড়ে আস্ত একটা জীবন হোটেল-মোটেলে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্দশা তার পিঁছু ছাড়েনি। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি হয়ে পড়েছেন অসহায়। সর্বশেষ মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচারিত হয়েছিল হাসপাতালে তাকে দেখার কেউ নেই!

হাসপাতাল ছাড়লেও ভালো নেই কবি হেলাল হাফিজ। হাসপাতাল ছেড়ে তরুণ কবি ইসমত শিল্পীর বাসায় উঠলেও দ্রোহ আর প্রেমের কবির থাকার জায়গা নেই। তার ভবিষ্যত গন্তব্য অনিশ্চিত।

জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর ২০২২ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় কবি হেলাল হাফিজ হাসপাতাল থেকে রিলিজ পান। কবির শারীরিক পরিস্থিতিতে তিনি আগে যে হোটেলে থাকতেন সেখানে থাকা সমীচিন নয়। এই অবস্থায় কবির থাকার জন্য অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করা যায়নি। কবির সম্মতি সূচক আলোচনার মাধ্যমে এবং অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপ সাপেক্ষে ইসমত শিল্পীর বাসায় কবির থাকার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। 

এ প্রসঙ্গে কবি ইসমত শিল্পী জানান, গত ২০ অক্টোবর থেকে দুই সপ্তাহ আমি কবির শারীরিক মানসিক যত্ন যথাসম্ভব দিতে চেষ্টা করছি। আমার সামর্থ অনুযায়ী তাকে দেখাশোনা করবার চেষ্টা করছি। তিনি একটু একটু করে সুস্থতার দিকে এগোচ্ছেন।

নিয়মিত চারবার ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা, ইনস্যুলিন দেয়াসহ শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী খাবার খাওয়ানো, তাকে মানসিকভাবে সাহচর্য দিচ্ছেন ইসমত শিল্পী এবং তার ছেলে। তবে কবির যত্ন নিয়ে শিল্পী নিজেও আছেন দুশ্চিন্তায় আছেন।

শিল্পী আরও জানান, হেলাল হাফিজ বলেছেন, হাসপাতালে থাকতে খুব খারাপ লাগে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলবেন কি না, উনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তো নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। উনাকে বারবার বলতে গেলে যদি কোনো কারণে বিরক্ত হন। তখন তো সেটা দুঃখজনক হবে। কিন্তু উনি তো কূলকিনারা পাচ্ছেন না। হাসপাতালে থাকার সময় কয়েকবার ‘আত্মহত্যা’র কথাও নাকি উনার মনে উঁকি দিয়েছে। হাসপাতালে থাকলে খুবই একা অনুভব করেন। এজন্য উনি হাসপাতালে থাকতে চান না।

দ্রোহ আর প্রেমের কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য কেটেছে নিজের শহরেই।

১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। উত্তাল ষাটের দশক হয়ে ওঠে তার কবিতার উপকরণ।

১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের সময় রচিত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি তাকে কবিখ্যাতি এনে দেয়। তার কবিতা হয়ে উঠেছিল মিছিলের স্লোগান।

‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ কালজয়ী কবিতার এ লাইন দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পরবর্তীতে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলেন সময়ও কবিতাটি মানুষের মাঝে তুমুল সাড়া জাগায়।

১৯৮৬ সালে প্রকাশিত প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘যে জ্বলে আগুন জ্বলে’ কবিকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এরপর বইটির ৩৩টির বেশি সংস্করণ বেরিয়েছে। দীর্ঘসময় নিজেকে অনেকটা আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন হেলাল হাফিজ।

আড়াই দশক পর ২০১২ সালে তিনি পাঠকদের জন্য আনেন দ্বিতীয় বই ‘কবিতা ৭১’। তৃতীয় এবং সর্বশেষ বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে।

ইত্তেফাক/পিও

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন