রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অর্থ লুটপাটকারীদের গুলি করা উচিত: হাইকোর্ট

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২২, ২২:২১

যারা দেশের অর্থ পাচার করে, যারা ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের আমানতের টাকা লুট করে তাদের ‘গুলি’ (শুট ডাউন) করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন আদালত। 

মঙ্গলবার (৮ নভেম্বর) বেসিক ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতকারী দুদুকের মামলায় এক আসামির জামিন শুনানিকালে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন। 

বেসিক ব্যাংক থেকে আত্মসাত করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ টাকা। আত্মসাতের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫৬টি মামলা করে দুদক। গত ৭ বছরেও এসব মামলার তদন্ত শেষ করতে পারেনি কমিশন। এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালত বলেছেন, বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে কিন্তু দুদক তদন্ত শেষ করতে পারছে না। তদন্তই যদি শেষ না হয় তাহলে অপরাধীদের বিচার হবে কীভাবে? 

আদালত বলেন, অর্থ পাচারকারীরা দেশ ও জাতির শত্রু। এদের দুর্নীতির কারণে দেশ এগিয়ে যেতে পারছে না। এদের বিরুদ্ধে সামারি ট্রায়াল পরিচালনা করা দরকার।
 
বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দায়ের করা হয় ৫৬ মামলা। উক্ত ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা হতে প্রায় দুই হাজার ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা যা সুদসহ দুই হাজার ৫৯০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে দুদক প্রাথমিক অনুসন্ধান করে এসব মামলা দায়ের করে। এসব মামলার তদন্ত চলছে গত সাত বছর ধরে। কিন্তু কোনো মামলারই তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। কবে তদন্ত শেষ হবে সেটাও স্পষ্ট নয়।
 
এই ৫৬ মামলার মধ্যে পল্টন থানায় দায়েরকৃত তিনটি মামলায় জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী। মামলায় অভিযোগে বলা হয়, শান্তিনগর শাখার ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনকালে এই ব্যাংক হতে বিভিন্নভাবে ৩৬২ কোটি ৭০ লাখ ৮১ হাজার টাকা আত্মসাত করা হয়। ২০১৯ সালের ৯ জুন মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করে দুদক। পরে তিনি কারাগার থেকে হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। 

গত ২০ এপ্রিল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ বেসিক ব্যাংকের ৫৬ মামলার তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করতে দুদককে নির্দেশ দেয়। এজন্য ছয় মাস সময়ও দেওয়া হয়। মঙ্গলবার মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। কিন্তু দুদকের পক্ষে তদন্তের কোনো অগ্রগতি আদালতে দাখিল করা সম্ভব হয়নি। 

আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, ব্যাংকের আত্মসাত হওয়া ঐ অর্থ কোথায় গিয়েছে সেই গতিপথ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ণয় করতে পারেনি কমিশন। অর্থের গতিপথ নির্ণয় করে প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্তকরণ প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে। 

এ পর্যায়ে আদালত বলেন, অর্থ কোথায় গেলো সেটা খুঁজতে গিয়ে অযথা সময় নষ্ট করছেন। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট যে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এই আত্মসাতে কারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনুন। তাহলে অপরাধ কমবে। যদি অর্থ কোথায় গেলো এটা খুঁজে অযথা সময় নষ্ট করেন তাহলে এরা বিচারের বাইরেই থেকে যাবে। 

দুদক কৌসুলিকে আদালত বলেন, বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতে জড়িতদের কি বিচারের আওতায় আনবেন না। যদি বিচারের আওতায় না আনেন তাহলে এদের শাস্তি তো ‘শুট ডাউন’ হওয়া উচিত। কারণ দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হলো। এখন অর্থ পাচারকারী ও ব্যাংক লুটপাটকারীদের কাছে কি দেশের জনগণ পরাজিত হয়ে যাবে। এটা কখনোই হতে দেওয়া যাবে না। 

আসামি পক্ষের আইনজীবী এসএম আবুল হোসেন বলেন, রাঘববোয়ালরা এই মামলার আসামি হয়েছেন। তারা অনেকেই জামিনে আছেন। মোহাম্মদ আলীরও জামিন দেওয়া উচিত। এ সময় শুনানিতে তাকে সহায়তা করেন জোবায়দুর রহমান।
 
শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেসিক ব্যাংকের সকল মামলার তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা ২১ নভেম্বর লিখিত আকারে আদালতকে অবহিত করতে দুদককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

ঘুষ লেনদেন হয় ডলারে!

এদিকে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও সিলেটের কারাগারে অনেক কারারক্ষী চাকরি করছেন। এ নিয়ে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে কারা কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ৮৮ জনের জাল জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন পাওয়া গেছে যারা একজনের পরিবর্তে আরেকজন চাকরি করছেন। 

বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে মঙ্গলবার এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এ সংক্রান্ত মামলার শুনানির এক পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, গণমাধ্যমে দেখা যায়, ঘুষ লেনদেনে বস্তায় বস্তায় টাকা বিনিময় হয়। 

তখন আদালত বলেন, এ রকম একটি স্পর্শকাতর জায়গায় যদি এ রকম অনিয়ম হয়, তাহলে কিন্তু এটা একটা অশনি সংকেত। বেশ বড় ধরনের অভিযোগ। এখন আর বস্তায় নয়, ঘুষ নিচ্ছে ডলারে। এসব বিষয়ে দুদক তো দেখে না। 

জহুরুল ইসলাম এশু নামে একজনের পরিবর্তে কারাগারে চাকরি করছেন একই নামের আরেকজন। এ সংক্রান্ত মামলার শুনানিকালে আদালত এ মন্তব্য করেন। আদালতে দুদকের পক্ষে খুরশীদ আলম খান ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার শুনানি করেন। শুনানি শেষে আদালত আদেশের জন্য বুধবার দিন ধার্য রেখেছেন।

ইত্তেফাক/পিও