সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নয়া দালান: ভিন্নধর্মী গবেষণা প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২২, ২২:৪৪

গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তা সমাধানে প্রস্তাবনা, নিজস্ব ইতিহাস ঐতিহ্য ও সাস্কৃতিক উপাদানগুলোকে ধরে রাখা এবং টেকসই উন্নয়ন। বলছি চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার আঞ্চলিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'নয়া দালান' এর কথা। প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য-উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। পরিবেশ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আর্থ-সামাজিক, আইন ও বিচার নিয়ে একাডেমিক ও মাঠ পর্যায়ের গবেষণার পাশাপাশি ১০টি বিষয়ভিত্তিক গবেষণা করছে নয়া দালান। কাজ করছে মীরসরাইয়ের জনমানুষ ও তাদের সামগ্রিক কল্যাণে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানি, আবাসন, বৃক্ষরোপণ তাদের কাজের ক্ষেত্র।

শুরুর গল্পটা জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মুজাহিদুল ইসলাম বলছিলেন, চোখের সামনে দেখছিলাম একটা গ্রামের চিরায়ত রুপ কেমন পাল্টে যাচ্ছে। যদিও আমি সংশয়বাদী নই, তবুও শিল্পের ঘাতে আমার প্রিয় প্রাঙ্গন যাতে নষ্ট না হয় এমন আশাবাদ নিয়েই আমাদের কজন তরুণের প্রাথমিক চিন্তা একত্রিত হলো। গবেষণা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হবে এমন ধারণা আমাদের মাথায় দিলেন আমাদের প্রধান উপদেষ্টা এমডি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। যার চোখ দিয়ে আমাদের স্বপ্ন দেখা এবং আজকের পূর্ণতা। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার স্টেকহোল্ডারদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনা, পর্যালোচনা, মতামত গ্রহণ শেষে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী নয়া দালানের কনসেপ্ট সবার সামনে উপস্থাপন করেন৷ সকলের সম্মতিতে এরপর নয়া দালানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। একেবারে শুরুর দিকে নয়া দালানের কাজ ছিলো পরিবেশ সংক্রান্ত। যেহেতু মীরসরাইতে দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেখানে পরিবেশগত মেজর কিছু সমস্যার আশঙ্কা আমরা করছিলাম। আর আগে থেকেই বেশ কিছু পরিবেশগত সমস্যাও ছিলো৷ তাই নতুন পরিস্থিতিতে আমরা সাধারণ মানুষজন যাতে নিরাপদে থাকি, উন্নত পরিবেশ পাই, গ্রামীণ স্বকীয়তা বজায় থাকে ও কৃষি জমিগুলো রক্ষা পায় এসব বিষয় নিয়ে কাজ করছিলাম। পরবর্তীতে স্বকীয়তার বিষয়গুলো আমাদের আরো কিছু কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।

মীরসরাইয়ের সামগ্রিক উন্নয়নে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তা সমাধানে নয়া দালানের কার্যক্রম সুদূরপ্রসারী। ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয় এবং আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০২০ সালে। নয়া দালান নামকরণের প্রেক্ষাপটটিও বেশ চমকপ্রদ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রেক্ষিতে মীরসরাই নতুন অবকাঠামো লাভ করতে যাচ্ছে। নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে সামাজিক বিন্যাস, পরিবর্তন আসছে সংস্কৃতিতে। কাঠামোগত নতুন এই রুপকে প্রতীকী অর্থে ইতিবাচকভাবে ধারণ করার জন্যই এই নামকরণ। অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের ব্যাপ্তি প্রশংসার দাবিদার। বিষয়ভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি সমৃদ্ধ মীরসরাই গড়ার লক্ষ্যে জীবনমান জরিপ, কর্মসংস্থান, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে বই পড়া কর্মসূচি, জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিম্পোজিয়াম ও সেমিনার, বজ্রপাত প্রতিরোধে সমগ্র উপজেলায় ৫ হাজার তাল গাছ রোপণ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে নয়া দালান। নয়াদালান তাদের এসকল কাজে যুক্ত করেছে এ অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও তরুণদের। পরিচালনা পর্ষদে ১৪ জন এবং রিসার্চ এসিসট্যান্ট ৩০ জন ছাড়াও প্রতিষ্ঠানে কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছেন প্রায় ১০০ জন তরুণ। কর্মসূচি বাস্তবায়নে নয়া দালানের ফান্ডিং এর যোগান দেন মূলত উপদেষ্টারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন যারা সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাদের মাধ্যমে তহবিল গঠন করা হয়েছে৷ 

নয়া দালান-এর ঐতিহ্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টা ও এ বিষয়ে চর্চা বেশ সাড়া ফেলেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিশেষ কিছু কর্মসূচি। শুরুতেই নয়া দালান একটি বড় সফলতা পায় প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায়। নয়া দালান টিম এবং তাদের উপদেষ্টা গবেষক ওসমান গণির প্রচেষ্টায় ওয়াহেদপুর ইন্দ্র পাহাড়ে উন্মোচিত হয় আড়াইহাজার বছরের অধিক পুরনো প্রত্ননিদর্শন। এখানকার একটি স্যাম্পল আমেরিকার কলারাডো স্টেটের 'আর্টেমিস টেস্টিং ল্যাব' এ পরীক্ষা করে সময়কাল জানা যায়। যা প্রত্নতত্ত্ব সংশ্লিষ্টদের নিকট ব্যাপক সাড়া ফেলে। বর্তমানে সরকার সেখানে খননকার্য পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

'নয়া দালানের শুরুর দিকে এতো বিশদভাবে কাজ করবো ভাবিনি। কিন্তু আমাদের টিমের দক্ষতা, কাজের স্পৃহা ও সফলতার মাত্রা আমাকে দারুণ উদ্বেলিত করে৷ টিম স্পিরিটের কারণে বড় স্বপ্ন দেখতে আত্মবিশ্বাস পাই। ইন্দ্র পাহাড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সফলতার পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক আমাদের চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেখানে সম্মেলন কক্ষে তিনি বলেছিলেন এরকম নয়া দালান বাংলাদেশের সব উপজেলায় হওয়া দরকার। আমি বিশ্বাস রাখি এবং স্বপ্ন দেখি এদেশের তরুণরা নিজ শ্রম, মেধা ও দক্ষতায় একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে নিবে একদিন। সেই স্বাপ্নিক বুনিয়াদ শুরু হোক নিজ নিজ গ্রাম থেকে নয়া দালানের তরুণদের মতো করে। নিজস্বতাকে ধারণ করে, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সর্বত্রই পরিবর্তন আসুক। আমাদের নয়া দালান কে সেক্ষেত্রে সারা বাংলার মডেল হিসেবে দেখুক, চিন্তার পাথেয় হিসেবে নিক এটাই আমার স্বপ্ন।' এভাবেই নয়া দালান নিয়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানালেন মুজাহিদুল ইসলাম। সত্যিকার অর্থে প্রতিটি এলাকায় নয়া দালান-এর মতো প্রতিষ্ঠান এবং কর্মসূচি থাকলে সে এলাকার ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন