প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৯, ১৭:৩৭

সত্যজিত্ বিশ্বাস

ফারুক সাহেবের লঞ্চ ভ্রমণ

মানুষের ভিড়ে কাবাডি খেলতে খেলতে ফারুক সাহেব কোনোমতে পরিবার সমেত লঞ্চের কেবিনে এসে হাঁফ ছাড়লেন। দ্বিগুণ দাম দিয়েও লঞ্চের টিকিট পেতে জিহ্বা আক্ষরিক অর্থেই অনেকটা বের হয়ে গেছে। ঈদের ছুটি শেষে সবারই শহরে ফেরার তাগিদা। ঠেলেঠুলে পুরো লঞ্চে যখন সুঁই ঢোকার রাস্তাও বন্ধ তখন নিতান্ত অনিচ্ছায় লঞ্চের মাস্টার সাইরেন বাজিয়ে ঘাট ছাড়ল। আর ফারুক সাহেব ছাড়লেন স্বস্তির নিঃশ্বাস। 

হেলেদুলে চলতে শুরু করার ঘণ্টাখানেক পর হঠাত্ লঞ্চ ভীষণ দুলতে শুরু করে দিল। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টার পর লঞ্চের মাস্টার মাইকে ঘোষণা দিল, ‘দুঃখিত, আমি আর সামলাতে পারছি না। অতিরিক্ত ভারে লঞ্চ ডুবতে চলেছে। আপনারা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিন।’   

শুনে তো উপস্থিত সবাই হা। ফারুক সাহেব চিত্কার করে প্রতিবাদ জানালেন, ‘দ্বিগুণ টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছি কী, পানিতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে যাওয়ার জন্য? আপনি না পারলে, যে পারে তার হাতে দিন লঞ্চটা।’    

লঞ্চের মাস্টার ইশারায় ফারুক সাহেবকে কাছে আসতে বলল। ফারুক সাহেব জামার ভাঁজ টেনেটুনে ঠিক করে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন। তারপর কেশে গলা পরিষ্কার করে মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে যেই বোঝাতে যাবেন, অমনি কোনো কথা না বলে হাতে ড্রাইভিং হুইল ধরিয়ে দিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল লঞ্চের মাস্টার।

তারপরের ঘটনা ইতিহাস।    

 

রইছ সাহেবের ট্রেন ভ্রমণ

লোকাল ট্রেনই হোক আর আন্তঃনগর ট্রেনেই হোক আমাদের দেশের ট্রেন যে সুকুমার রায়ের চরম ভক্ত তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঝিক ঝিক-ঝিকির ঝিকির ঝিক, ঠ্যাক ঠাক-ঠ্যাকাত ঠ্যাক, ঠ্যাক ঠাক-ঠ্যাকের ঠ্যাক কত তালেই না চলে। চলার গতির সাথে তাল মিলিয়ে দুলতে দুলতে, ফুল সাউন্ডে অসাধারণ ছন্দ শুধু চলন্ত ট্রেনই তুলতে পারে। এমনই এক আন্তঃনগর ট্রেন ঈদ ফেরত যাত্রী নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাচ্ছে। চোখ বন্ধ করে অপূর্ব সেই ছন্দ রইছ সাহেব মোহিত হয়ে শুনছিলেন।

হঠাত্ করেই সেই ছন্দ একেবারে বন্ধ করে দিয়ে নিঃশব্দে ছুটতে শুরু করল ট্রেন। চোখ খুলে সামনে ট্রেনের টিটিকে দৌড়াতে দেখে রইছ সাহেব ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিরে ভাই, দৌড়াচ্ছেন কেন? ট্রেনটাকে এখন তো বিদেশি ট্রেনের মতো মনে হচ্ছে। কোনোরকম ছন্দের ঝংকার, দোলাদুলি ছাড়াই এত মসৃণ গতিতে কী করে লাইনে ছুটে চলেছে?’ টিটি বিমর্ষ ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, ‘ভাই রে, ছন্দ কবিতা বাদ দিয়ে এখন আল্লাহ খোদার নাম নেন। ট্রেন এখন আর লাইনে নাই।’   

 

রাকিব সাহেবের বাস ভ্রমণ

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে বাস ছাড়ার একটু পরপর হ্যান্ড মাইকে সবিস্তারে অবস্থান জানাচ্ছে বাসের স্মার্ট সুপারভাইজার। যক্ষ্মার কাশির বেগে চলতে থাকা বাস কুমিল্লা এসে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে দোলা শুরু করে দিল। বাসের সুপারভাইজার কোনোমতে একটা সিটের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে নিল, ‘সম্মানিত যাত্রীগণ, আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আমাদের বাসের ব্রেক কাজ করছে না। আপনারা কিন্তু একটুও ভয় পাবেন না। চলার পথে এমন হতেই পারে। আপনারা আপনাদের সিটের পাশের জানালা খুলে একজন একজন করে লাফিয়ে পড়ুন। দয়া করে গ্লাস ভাঙবেন না। তাড়াহুড়া করবেন না। প্রতি দুজনের জন্য একটি করে জানালা রয়েছে।  

পেছন থেকে রাকিব সাহেব চিত্কার করে উঠলেন, ‘এসব কী বলেন? চলন্ত বাস থেকে লাফ দিব কী করে? ভয়েই তো মরে যাব। লাফ দিতে পারব না। আর কোনো উপায় নেই বাঁচার?’

সুপারভাইজার বিগলিত হাসি উপহার দিয়ে আবার বলা শুরু করল, ‘যারা চলন্ত বাস থেকে লাফ দিতে ভয় পাচ্ছেন, তাদের জন্য একটা সহজ উপায় আছে। আপনারা আরামে সিটে বসেও এক্সাইটিং মুহূর্তগুলো উপভোগ করতে পারেন। আমাদের কোম্পানির সিটগুলোর মান অন্যদের তুলনায় অনেক ভালো। যা হোক, আমাদের হাতে আর সময় নেই। ওই যে আমাদের ড্রাইভার জানালা খুলে লাফ দিল। আমিও এখনই লাফিয়ে পড়ব। আমাদের কোম্পানির বাসে ভ্রমণের জন্য আপনাদের শেষবারের মতো ধন্যবাদ। আলবিদা।’  

 

ফারুক সাহেব, রইছ সাহেব, রাকিব সাহেবের ঈদ ভ্রমণের কথা শুনে কী ভাবছেন? গন্তব্যে যাবেন কিভাবে, তাই তো! 

আমি বলি কী, বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে কিংবা ব্ল্যাক থেকে দ্বিগুণ দামে টিকিট না কিনে সব ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটা দিলে কেমন হয়?

—কী বললেন, অসম্ভব?

তাহলে কানের ময়লা ভালো মতো পরিষ্কার করে শুনুন, প্রতিদিন চল্লিশ কিলোমিটার হেঁটে এই সেদিনও আমাদের দেশের খ্যাতিমানরা স্কুলে যেতেন। শুধু যেতেনই না, আবার ফিরেও আসতেন। তো, আপনি কোন বঙ্গের লাট বাহাদুর শুনি?