বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পাহাড়ি জমিতে পেঁপে চাষে সফলতা

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২২, ১৪:৩৪

১০ বিঘা জমি। সেই জমিতে সারি সারি গাছ। ছয় ফুট উচ্চতার সারি সারি গাছে দেড় কেজি ওজনের রেড লেডি পেঁপে। রেড লেডি জাতটি অধিক ফলনশীল ও আকর্ষণীয় হাইব্রিড পেঁপে। এই পেঁপে চাষ করে চমক দেখিয়েছেন বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার পানবাজার গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মোরশেদ আলম।

পাহাড়ের ঢালু জমি আর নদীর তীরে ফসলি জমিতে পেঁপে চাষ করে সাফল্য অর্জন করেছেন শিক্ষিত এই তরুণ। কয়েক বছর চাকরি করার পর নিজেই কিছু করার স্বপ্ন দেখেতে শুরু করেন। সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দেয় নিজের পতিত জমিতে। বাণিজ্যিকভাবে শুরু করেন রেড লেডি জাতের পেঁপে চাষ।

পাহাড়ের ঢালু জমিতে পেঁপে চাষ। ছবি: ইত্তেফাক

গত তিন বছর ধরে বাগান করেন তিনি। দুই বছরের অধিক সময় ধরে ফলন আসতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে ২৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। তার সফলতা দেখে অনেক চাষি পাহাড়ি ভূমিতে পেঁপে চাষে এগিয়ে এসেছেন।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঝিরির তীরে জমিতে তামাক চাষ করতেন, সেখানেই গড়ে তুলেছেন পেঁপের বাগান। প্রায় ১০ বিঘা জায়গায় রোপণ করেছেন রেড লেডি জাতের ৪ হাজারের অধিক পেঁপে গাছ।

মোরশেদ আলম জানান, চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে ২০০৭ সালে অনার্স পাস করার পর দীর্ঘসময় বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় (এনজিও) কাজ করেন তিনি। এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন। করোনায় অফিসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরে কৃষিকাজে মনোযোগ দেন। পত্রিকায় রেড লেডি জাতের পেঁপে চাষের প্রতিবেদন পড়ে বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেন।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। পাহাড়ের মাটি পেঁপে চাষের জন্য উপযুক্ত। নদীর তীরের জমিতে প্রচুর পলি জমার কারণে ফলনও ভালো হয়। চারা রোপণের প্রায় ৫ মাস পর পেঁপে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। এর দুই থেকে চার মাস পরই ফলন তোলার সময় হয়।

পেঁপে বাজারজাতের প্রস্তুতি। ছবি: ইত্তেফাক

গত ৩ বছরে ১৪০ বার পেঁপে বিক্রি করেছেন মোরশেদ। আরও ২৫ বার বিক্রি করা যাবে বলে আশা করছেন।

স্থানীয় বাজারে পেঁপে ৪০ টাকা এবং পাইকারি ২০-২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। প্রতিবারে ৫ হাজার কেজি পেঁপে বিক্রি করেন, যার মূল্য পাইকারিতে আনুমানিক ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। এসব পেঁপে ঢাকা থেকে আগত ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যান।

ঢাকা থেকে আগত পাইকারি ক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি মাসে ১ থেকে ২ বার আসি। প্রতিবারে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কেজি পেঁপে কিনে আড়তে নিয়ে যাই।

মোরশেদ আলম বলেন, আমার বাগানে দৈনিক ৫-৬ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের বেতন দৈনক ৫০০ টাকা করে, অর্থাৎ প্রতিদিন মোট ২৫০০ টাকা। এই পেঁপে বেশ সুমিষ্ট হওয়ায় বাজারে চাহিদা ভালো। ইতোমধ্যে ৩৭ লক্ষ টাকার পেঁপে বিক্রি করলেও বাগানে রয়েছে আরও ৫ লক্ষ টাকার ফসল। গত ৩ বছরে শুরু থেকে এই পর্যন্ত ৩০ লক্ষ টাকা মতো খরচ হয়েছে।

মোরশেদ আলমের ভাষ্যমতে, নিয়মিত পানি সেচ ও জৈব সার প্রয়োগে বাগান থেকে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। আগামীতে আরও বড় আকারের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলের নদীতীরের জমি আর পাহাড়ের ঢালু অংশে এই জাতের পেঁপে চাষে দারুণ সম্ভাবনা আছে। তবে ভালো বিপণন ব্যবস্থা থাকলে কৃষক আরও লাভবান হতো।

উপ-সহকারী কৃষি অফিসার রেজাউল করিম বলেন, রেড লেডি জাতের পেঁপে বেশ সুস্বাদু। পাহাড়ের ঢালু অংশে এর চাষাবাদ বেশ সহনীয়। বিশেষ করে পাহাড়ের ২৫ থেকে ৪৫ ডিগ্রি ঢালু অংশে এই জাতের পেঁপের ফলন অনেক বেশি হয়, যাকে বলে বাম্পার। রেড লেডি চাষ করে কৃষক অল্প সময়ে লাভবান হচ্ছেন। যার বাস্তব প্রমাণ কৃষক মোরশেদ আলম। উনাকে দেখে এখন অনেক কৃষক পেঁপে চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পেঁপের ভাইরাস মোকাবেলাসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসকে