শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লাউবাড়ী: সাধুদের জন্য অরক্ষিত

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ১৯:৪০

দুপুর ১২টায় আমি আর কুষ্টিয়ার গৌরাঙ্গ দাদা দৌলতপুর থানায় উপস্থিত হলাম। ওসি মুজিবর রহমান ছিলেন না; শুনলাম রাউন্ড এ বের হয়েছেন। আমরা দুজন গুরু নামের সাহসে একটি ভ্যানে করে লাউবাড়ী গ্রামে রওনা করলাম। গ্রামটি সুন্দর; ঢুকেই মনে হলো সাধুদের জন্যই তৈরি। ভ্যান চালকের সাথে হামলা বিষয়ে কথা হচ্ছিলো। সে বললো, ‘এমনটা করা উচিত হয়নি; বিশেষ করে ভিনদেশী সাধুদের গায়ে হাত দেয়া উচিত হয়নি’। প্রতিউত্তরে আমি বললাম, ‘শুধু উচিত হয়নি বলার মধ্যে আমি আপনার মৌন সম্মতির গন্ধ পাচ্ছি। আপনি যদি বলতেন ওরা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছে; তাহলে আমি বুঝতাম আপনার ফকিরদের প্রতি সহমর্মিতা আছে’। প্রথমে আমার কথা না বুঝলেও কিঞ্চিত পরে লোকটা হেসে দিলো। কথা বলতে বলতে আমরা লাউবাড়ী গ্রামের মসজিদের সামনে উপস্থিত হলাম। 

একটা সরু রাস্তার দুইপাশে সারিবদ্ধ ঘর, কারো ইটের, কারো টিনের, কারো মাটির। ফাঁকা পথ। বয়স্ক এক লোক হেঁটে আসছেন। কোন বাড়িতে হামলা হয়েছে জিজ্ঞেস করাতে মসজিদের সামনের একঘর পর ইশারায় দেখিয়ে দিলেন। ঘরের ভিতর ঢোকার পর পরিবারের লোকেরা একে একে ঘিরে ধরলো। সম্ভবত ঘটনার পর ওনাদের বাড়িতে গিয়ে কেউ কোনো সহমর্মিতাও জ্ঞাপন করেনি। আমাকে কাছে পেয়ে আতঙ্কিত মানুষগুলো যেন ভরসা খুঁজতে লাগলেন। মনের সব বেদনা-ব্যাথা প্রকাশ করতে লাগলেন। তাঁদের আর্তি আমাকে বিষন্ন করে তোলে। 

ভিকটিম পরিবারের প্রধান কর্তা পলান মন্ডল বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে পরিচয় হলো পরান ফকিরের বাবা কিনু মন্ডল (৭০), সহধর্মীনি জেসমিন (৩০), প্রতিবন্ধী বোন আকলিমা (৪০), বড় মেয়ে টুম্পা (১৩) ও মেঝো ছেলে জাসিন (১০) এর সাথে। ছোটো একটা ভিটায় উঠানের মাঝখানে ১২ ফিট বাই ১০ফিট এর একটা জীর্ণ আশ্রম ঘর ভাঙ্গা পড়ে আছে। ‘এই ঘরেই সাধুসঙ্ঘ হচ্ছিলো?’ প্রশ্ন করতেই সবাই পুরো ঘটনার বিবরণ দিতে শুরু করলেন। পলান এর বোন আকলিমার এক হাত আগে থেকেই পোড়া। তিনি  কিছুটা অসহায় বলে ভাইয়ের বাড়িতে থাকেন। আকলিমা তার শরীরে বেশ কয়েকটা আঘাতের দাগ দেখালেন। 

পলান ফকিরের বাড়িতে গত ৮-১০ বছরে গোটা পঞ্চাশেক সাধু ও ভক্ত সমাগমে সাধুসঙ্ঘ হয়েছিল। এবারও ঘরোয়া পরিবেশে অনুষ্ঠান পরিচালিত হবে। কিন্তু পলান ফকিরের পরিকল্পনা জানার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত বাবুল মন্ডল তার দলবল নিয়ে সাধুসঙ্ঘ আয়োজন না করতে চাপ দিতে থাকেন। উচ্চ শব্দে গান গাওয়া হবে না, কোনো সাউন্ড সিস্টেম ব্যাবহার করা হবে না ইত্যাদি প্রতিশ্রুতি দেন পলান ফকির। কিন্তু তাতেও বাবুল মন্ডল ও তার দলবলের ‘নিষেধাজ্ঞা’ বহাল থাকে। 

পলান তাদের হুমকি উপেক্ষা করে সাধুসঙ্ঘ আয়োজন করেন। এবার জনাচল্লিশেক সাধু ও ভক্ত অংশগ্রহণ করেন। কথা না শোনার দায়ে গ্রামবাসী নিয়ে বাবুল মন্ডল ৫ নভেম্বর পলান ফকিরের পরিবারের সদস্য ও সেখানে আসা সাধু-ভক্তদের ওপর নির্বিচারে লাঠি, বাঁশ ইত্যাদি দিয়ে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে।  অতিথি বয়োঃবৃদ্ধ সাধুদের হাতজোড় অনুরোধও তাদের থামাতে ব্যর্থ হয়। 

তবে অভিযুক্তদের সাফাই আছে যে, পলানই প্রথম বাবুলকে আঘাত করেছেন। যদিও এ তথ্যের সত্যতা মেলেনি এবং বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ মনে হয়নি। পলান মন্ডলের পরিবার সামাজিকভাবেই কোণঠাসা, একঘরে বলা যায়। সাধক জীবনের প্রতি অনুরাগী পলান স্বভাবতই অত্যন্ত বিনয়ী এবং অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি সহানুভুতিশীল। তাই পলানের পক্ষে আগবাড়িয়ে ক্ষমতাধর বাবুল মন্ডলের গায়ে হাত তোলার অভিযোগ সত্য মনে হয়নি। 

মফেজ মন্ডলের ছেলে অভিযুক্ত বাবুল মন্ডল সম্পর্কে পলান ফকিরের এর চাচাতো ভাই। বাবুল এলাকার মসজিদ কমিটির সভাপতি এবং রাজনৈতিক সাপোর্টে এলাকায় তার প্রভাব প্রতিপত্তি রয়েছে। পলান এর পরিবারের সাথে বাবুল এর পারিবারিক কলহ বা প্রতিহিংসা থাকতে পারে। তবে এখানে বার বার ফকিরি ধর্মের দায় উঠে এসেছে; বাবুল ফকির সহ্য করতে পারে না। এ মনোভাব শুধু বাবুলের নয়। ওই গ্রামে পলানরা যেমন মাত্র এক ঘর ফকির, তেমনি সমাজ তাদের একঘরে করে রেখেছে। মাত্র একজন লোককেই তাদের বাড়িতে নিঃশব্দে উপস্থিত হতে দেখেছি। ওনাকে একটা প্রশ্ন করাতে মুখে হাত দিলেন, আর তাঁকে প্রশ্ন করতে নিষেধ করলেন। অনুরোধ করলেন, পলানের বাড়িতে তাঁর উপস্থিতি যেন গ্রামবাসী না জানে। 

আশপাশের পরিবারগুলোর সাথে পলান ফকিরের পরিবারের নূন্যতম সামাজিক সম্পর্ক নেই। এমনকি পলানের বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন কোন গ্রামবাসী না যায়, এমন হুকুম জারি করেছে মসজিদ কমিটি। 

কয়েকজন গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেলো, মসজিদ কমিটির এই আদেশের ব্যাপারে গ্রামবাসীরও সমর্থন রয়েছে। বাবুল মন্ডলের নেতৃত্বে এ ঘটনাকে একটি সংগঠিত হামলা বলা যায়। কারণ এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িসহ, পাশের গ্রামের ভাড়া করা পেটোয়া বাহিনী সম্মিলিতভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক পলানের বাড়িতে ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্যাতন চালায়। আসলে অভিযুক্ত করতে হলে মসজিদ কমিটিসহ পুরো গ্রামকে অভিযুক্ত করতে হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ করে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত আকলিমার কন্ঠে বেশ কয়েকেটি নাম উঠে এসেছে, যেমন, আজাদ, রফি, মাসুম, একরাম, সালামত, সাইফুল, আনা ইত্যাদি। 

১০ মিনিটের মতো ওই বাড়িতে ছিলাম। বাড়ির বাইরে থেকে বিভিন্ন উস্কানিমূলক হাসি-ঠাট্টার শব্দ পাচ্ছিলাম। বুঝলাম পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। বেড়িয়ে এলাম। মনে হলো, বাড়ির সামনে ও আশপাশে শ’খানেক মানুষ উপস্থিত। যতটা সম্ভব শক্ত থাকার চেষ্টা করলাম। শান্ত কন্ঠে তাদের বেশকতক কড়া কথা শোনালাম। আমার কথা শুনে মনে হলো তারা কিছুটা নমনীয় হয়েছে সাধু সঙ্ঘের সাধু-ভক্তদের ইঙ্গিত করে তারা অভিযোগ করে বলল, মসজিদের পাশে তারা কেন গান করে? বিশেষ করে নামজের সময়ও নাকি তারা ঢোল পেটায়। আমি বললাম ফকিরের বাড়িতে তো ঢোল পেটাবেই। যদিও পলান এর পরিবার এটা স্বীকার করলো না। তাঁরা বললেন, নামাজের অনেক পর গান শুরু হয়েছে। যাই হোক আমি দ্রুত স্থান ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেই। 

তারপরই মনে হলো একবার বাবুল মন্ডলের বাড়ি থেকে ঘুরে যাই। বাবুল মন্ডলের বাড়ি পৌঁছাতে মূহুর্তেই তার মেয়ে ও মাসহ বেশকিছু মানুষ জড়ো হয়ে যায়। আমি তাদের বললাম, ‘সাধুদের উপর আঘাত সহ্য করা হবে না। কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে না চাইলে এবং গ্রামের সম্মান বাঁচাতে আপনাদের পলান ফকিরদের সাথে যৌথভাবে একটি সাধুসঙ্ঘের আয়োজন করতে হবে’। যদিও পরিবার বলতে চাইলো বাবুল মন্ডল নির্দোষ। 

ঘটনাস্থল ত্যাগ করে আমরা আবার থানায় যাই। ওসি মুজিবর রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করি। তিনি কমলালেবু দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলাম অপরাধী ধরা পড়ার কারনে এবং সাধু-বাউলদের পাশে থাকার জন্য। বললাম লালন ফকির ও সাধু-বাউল সমাজ বাংলার সম্পদ। সাধু-ফকিরদের প্রতি ভক্তি থাকলে দেশ আপনাতেই উন্নত থেকে উন্নততর হবে। উনি সম্মত হলেন এবং বললেন যে এলাকার সাধু ফকিরদের প্রতি তিনি খেয়াল রাখবেন। আমরা ছোটো একটা ফটেসেশনের পর বেড়িয়ে এলাম। 

উল্লেখ্য গত ৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সাধুসঙ্ঘে নজিরবিহিন হামলা চালিয়ে সাতজন সাধু ও ভক্তদের রক্তাক্ত করে স্থানীয় ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ১৯ জন তালিকাভুক্ত আসামি গ্রেফতার করলেও মূল আসামি বাবুল মণ্ডল  ছাড়া বাকি ১৮ জনকে ঘটনায় তাদের প্রধান ভূমিকা না থাকার কথা বলে আদালত জামিন দিয়েছেন।

দেশের লালন ফকির অনুসারি সাধু ও তাঁদের ভক্তরা দীর্ঘকাল ধরে ফকিরি দর্শন অনুযায়ী জীবন যাপন করে আসছেন। এটি তাঁদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার। সাধু বা তাঁদের ভক্তরা নিজেদের বিশ্বাস ও চর্চা কখোনও অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন, এমন কোন নজির নেই। তাঁদের ওপর এ ধরনের হামলা বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের লঙ্ঘন। এ হামলা বাংলাদেশের সামাজে বিদ্যমান বৈচিত্র্য চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা। 

হামলার প্রতিবাদে দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ এর তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুসহ ১৫ বিশিষ্ট নাগরিক এক বিবৃতি প্রদান করেন। কুষ্টিয়া এবং দৌলতপুরে নহির ফকির, টুনটুন সাধু, হৃদয় সাধুসহ অন্যান্য সাধুদের উপস্থিতিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা আয়োজন করা হয়। 

লেখকঃ সাধক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

ইত্তেফাক/এএইচপি