শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নিপুণ হাতের নান্দনিক শিল্পটি হারিয়ে যাচ্ছে অর্থাভাবে

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২২, ১৬:০২

বাড়ির উঠোনের এক কোনো পাতানো মাদুরে বসে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান মিলে আপন মনে তৈরি করে চলেছেন বাঁশ-বেতের হরেক রকমের জিনিস। নিপুণ হাতের ছোঁয়া আর বেতের সাথে পেরেক ঠোকার অল্প সময়ের মধ্যেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে এসব নান্দনিক জিনিস।

তাদের তৈরি এসব শিল্প এখন দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে নেওয়া যাবে এক অন্যন্য উচ্চতায়, এমটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর উত্তরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহ-আলম আকন। অর্থাভাবে মাধ্যমিক পেরোনোর সুযোগ হয়নি তার। ছোট কাকা ওলিউর আকনের কাছ থেকেই প্রথম এ কুটির শিল্পে হাতেখড়ি হয় শাহ-আলম আকনের। অল্প দিনেই শাহ-আলম রপ্ত করে নেন এ কারুশিল্পের কাজ। বর্তমানে তিনি একজন দক্ষ কারিগর।

তার এ কারুশিল্পের মধ্যে রয়েছে খাট, দোলনা, পালকি, ওভাল গোল চেয়ার, স্কয়ার সোফা সেট, রকিং চেয়ার, নৌকা, মোরগ, মাইক, প্রজাপতি, আনারস, বাবুরাম সাপুরে, রিকশা, সাইকেল, ঘোড়া ও কলমসহ কমপক্ষে ৫০ রকমের আইটেম। একটি জিনিস দেখামাত্রই বেতের সাহায্যে অনায়াসে সেটি তৈরি করে ফেলতে পারেন শাহ-আলম।

তৈরি হয়ে হরেক রকমের নান্দনিক সব জিনিস। ছবি: ইত্তেফাক

তার এ কাজে সাহায্য করেন স্ত্রী রেবেকা সুলতানা। এছাড়া পড়াশোনার পাশাপাশি বড় ছেলে হৃদয় রায়হান, ছোট ছেলে রিজভী রায়হান ও ছোট মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসও কাজে হাত লাগায়। হাতে তৈরি কারুকাজের অপূর্ব এ শিল্পের সাথে গভীর যোগসূত্র রয়েছে তাদের। তাদের তৈরী নান্দনিক এ জিনিসপত্র চলে যাচ্ছে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ বাহিরের দেশ কানাডা, সিংগাপুর ও লন্ডনে।

প্রথমে নারায়নগঞ্জ, বরিশাল ও শরীয়তপুরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বেত সংগ্রহ করেন তিনি। পরে নানা আকৃতিতে কাটা হয় সেই বেত। এসব কাটা বেত দিয়ে ধাপে ধাপে পেরেক আর বেতের সুতার সাহায্যে এসব জিনিস তৈরি করেন থাকেন তিনি। বানানোর পরে করা হয় হালকা রঙের পালিশ। এখান থেকেই শাহ-আলম প্রতি মাসে আয় করেন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। আর এ আয় দিয়েই চলছে তার ৭ সদস্যের পরিবার।

একসময় তার এখানে কাজ করতেন বেশ কয়েকজন কর্মচারী। করোনা মহামারির কারণে অর্থ সঙ্কটে পড়ায় ছাড়তে হয়েছে সেসব কর্মচারীদের। সেই অর্থ সঙ্কট এখনও কাটিয়ে ওঠা হয়নি তার। বর্তমানে টাকার অভাবে মালামাল কিনতে না পারায় অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে তার এ কুটির শিল্পের কাজ। এখন শুধু পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এ কাজ করেন। তবে সরকারের সুদৃষ্টি পড়লে এ শিল্পকে ধরে রেখে হাজারও বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ করতে পারবেন বলে মনে করছেন শাহ-আলম।

সম্প্রতি সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠোনে মাদুর বিছিয়ে স্বামী-স্ত্রী দু'জন মিলে তৈরি করছেন বেতের হরেক রকমের জিনিস। তাদের পাশাপাশি এ কাজে সাহায্য করছে ছোট ছেলে রিজভী রায়হান। শাহ-আলম হাতুরি হাতে পেরেক ঠুকে ঠুকে এসব জিনিস তৈরি দিচ্ছেন স্ত্রী রেবেকা সুলতানার হাতে। রেবেকা আবার বেতের তৈরি সুতার সাহায্যে দিচ্ছেন বাঁধন। বাঁধনের শেষে পালিশের কাজ হচ্ছে। সারাদিন এ কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন তারা, যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। এভাবেই সকাল থেকে শুরু হয়ে তাদের কর্মব্যস্ততা, শেষ হয় সূর্য ডোবার মধ্য দিয়ে।

চর গোবিন্দপুর উত্তরকান্দি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা শামসুল হক মাতুব্বর (৬৫) বলেন, শাহ-আলম একসময় কয়েকজন কর্মচারী নিয়ে কাজ করতো। এখন পুঁজি কমে যাওয়ার নিজেরাই কাজ করে। সরকার থেকে যদি আর্থিকভাবে সাহায্য করতো, তাহলে এই কাজটা ধরে রাখতে পারতো।

পাশের বাড়ির দশম শ্রেণি স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থী জান্নাতুল নেসা বলেন, আমি পড়াশোনার পাশাপাশি শাহ-আলম কাকার কাছে হস্তশিল্পের কাজ শিখি। এখন টাকার অভাবে কাকার কাজ কমে গেছে। তাই আমারও কম আসা হয়। সরকার থেকে এখানে যদি একটা কারখানার ব্যবস্থা করা হতো, আমার মতো অনেক ছেলে-মেয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে কাজটা শিখে স্বাবলম্বী হতে পারতো।

স্বামী-স্ত্রী মিলে শৈল্পিক কাজটি করেন, সঙ্গে থাকে ছেলেও। ছবি: ইত্তেফাক

শাহ-আলম আকনের স্ত্রী রেবেকা সুলতানা বলেন, আমার স্বামী বেতের তৈরি কুটির শিল্পের কাজ করেন। আমি ঘরের কাজের পাশাপাশি তার কাজে এ কাজে সাহায্য করি। আমাদের ঘরের এখন সবাই এ কাজটা পারে। এ কাজটা অনেক পুরোনো ঐতিহ্যের। এ কাজ করতে অনেক টাকার চালান দরকার। বর্তমানে আমাদের চালান পুঁজি কম থাকায় কাজটা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আমরা এ কাজটা ধরে রাখতে চাই।

কথা হয় কারুশিল্পী শাহ-আলম আকনের সাথে। তিনি বলেন, ৩০ বছর ধরে আমি এ কাজটির সাথে আছি। দেশে-বিদেশে আমার এ কাজের অনেক চাহিদা আছে। কানাডা, সিংগাপুর ও লন্ডন থেকে আমার হাতের তৈরি মালামালের অর্ডার আসে। এখন চালানের অভাবে আমার কাজটা দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরকার থেকে আমাকে যদি একটা কারখানা তৈরি করে দেয় আর কিছু আর্থিক সাহায্য করে, তাহলে এ শিল্পটাকে ধরে রাখতে পারবো।

এ বিষয়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, আমি জানতে পেরেছি খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকার শাহ-আলম আকন বেত ও বাঁশ দিয়ে চমৎকার সব জিনিস তৈরি করতে পারেন। আমাদের দেশে এখন এমন যোগ্য লোকের প্রয়োজন। তার সাথে কথা বলে তাকে কীভাবে সাহায্য করা যায় ও তার দক্ষতাকে কাজে লাগানো যায়, আমরা সেই চেষ্টা করবো।

ইত্তেফাক/এসকে