বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

একই পরিবারে তিন সন্তানের থ্যালাসেমিয়া, বাঁচার আকুতি

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০২২, ১১:০৮

রফিকুল ইসলাম পেশায় দিনমজুর। কাজ-কর্ম করেই কোনোমতে অসুস্থ স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে দিন পাড় করছেন। যেদিন কাজ জোটে, সেদিন স্ত্রী-সন্তানদের মুখে খাবার জোটে। কাজ না জুটলে কোনোমতে একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন পাড় করতে হয়।

রফিকুল ইসলামের চার ছেলে। প্রথম ছেলে আবু হাসান (২৩), দ্বিতীয় ছেলে আবু হোসেন (২০) ও তৃতীয় ছেলে হাসু মিয়া (১৬)। এই তিন ছেলে জন্ম থেকেই থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। শুধুমাত্র সবচেয়ে ছোট ছেলে (১০) সুস্থ আছে। বয়স অনেক হলেও চেহারা ও আকৃতিতে তিন ছেলেকেই শিশুর মতো দেখা যায়।

এক মাস আগে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজারসহ মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বড় ছেলে আবু হাসানের অপারেশন করা হয়েছে। অপারেশনে খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এক সপ্তাহ হলো সে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসেছে। এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

মেজ ছেলে আবু হোসেন অসুস্থ শরীর নিয়ে পাশ্ববর্তী বটতলা বাজারে অন্যের দোকানে মাসিক দুই হাজার টাকা বেতনে কাজ করে। প্রতি মাসে দ্বিতীয় ছেলে আবু হোসেন ও তৃতীয় ছেলে হাসু মিয়ার শরীরে এক ব্যাগ করে রক্ত দিতে হয়। ডাক্তার বলেছে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে দুজনেরও অপারেশন করা খুবই জরুরি।

এতো টাকা কীভাবে জোগার করবেন, তা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দিনমজুর বাবা রফিকুল ইসলাম। অভাব-দারিদ্রতা তাদের নিত্যসঙ্গী। অসুস্থ তিন সন্তানের জন্য জীবনে অনেক কষ্টে জমানো টাকা-পয়সা, গরু-ছাগল বিক্রিসহ ধার-দেনা করে বড় ছেলে অপারেশন করে পথে বসেছেন রফিকুল। ঘরে এক কানাকড়িও নেই। কীভাবে দুই সন্তানের অপারেশন করাবেন, এ ভাবনায় ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যাচ্ছে তার চারদিক। একদিকে সংসারের ৬ সদস্যের পেটের ক্ষুধা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অন্যদিকে অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসা খরচ কীভাবে জোগার করবেন এ দুশ্চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বাবা। সব মিলিয়ে চরম দুর্দশা ও দুর্দিনে জীবন কাটাতে হচ্ছে পুরো পরিবারকে।

অর্থাভাবে অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে তিন ছেলের পড়ালেখা। অসুস্থ তিন সন্তানের সুচিকিৎসার জন্য সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের কাছে আর্থিক সহায়তার চেয়েছেন অসহায় হতদরিদ্র রফিকুল। কোনো আবাদি জমি নেই। মাত্র দেড় শতাংশ জমির বসতভিটায় একটি চালা ঘর ছাড়া সহায়-সম্বল কিছুই নেই তার।

পরিবারটির করুণ পরিনিতি দেখে স্থানীয়দের সহায়তায় ১৫ টাকা কেজির চালের রেশন কার্ডটি পেয়েছেন রফিকুল। এছাড়া আর নেই কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা। ছেলেদের চিকিৎসার টাকা তিনি পাবেন কোথায়? তাই চোখের সামনে একরকম বিনা চিকিৎসায় সন্তানদের ধুকতে দেখতে হচ্ছে।

হতদরিদ্র রফিকুল ইসলাম কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের মধ্য রাবাইতারী গ্রামের বাসিন্দা। জন্মের পর থেকে এ পর্যন্ত নিজের কিছু জমানো অর্থসহ আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ছেলের চিকিৎসার জন্য ভিক্ষা করে প্রায় সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন।

অনেকটা অশ্রুভেজা কণ্ঠে রফিকুল বলেন, 'ঘরে এক কানাকড়িও নেই বাহে! চোখের সামনে সন্তানদের এ করুণ পরিণতি আর সইতে পারছিন না। আমার সন্তানকে বাঁচান বাহে! অর্থাভাবে ছেলেদের চিকিৎসা এখন প্রায় বন্ধের পথে। টাকার অভাবে প্রতিমাসে দুই ছেলেকে রক্ত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সন্তনদের বাঁচাতে তিনি সহযোগিতা চেয়েছেন।

রফিকুল ইসলামের স্ত্রী হাজরা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বিক্রি করার মতো আর কিছুই নেই আমাদের। টাকার অভাবে ছেলেদের চিকিৎসা বন্ধের পথে। চোখের সামনে সন্তানদের এ করুণ পরিণতি আর সহ্য হয় না। তাই সন্তানদের বাঁচাতে সমাজের দানশীল হৃদয়বান ব্যক্তি ও সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও প.প. কর্মকর্তা ডা. সুমন কান্তি সাহা বলেন, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এ রোগে আক্রান্তদের শরীরে রক্ত দিতে হয়। নিরাময় না হলেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসায় এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমন দাস জানান, ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

ইত্তেফাক/এসকে