দক্ষিণ এশিয়ার অগ্রগতিতে বিবিআইএন উপ-আঞ্চলিক জোট

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৯, ২১:৪৯

আঞ্চলিক জোটের পর উপ-আঞ্চলিক জোট কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের একটি নতুন মডেল। একটি বড় দেশের এক বা একাধিক অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নই উপ-আঞ্চলিক জোটের মূল লক্ষ্য। চীনের ইউনান এবং গুয়াংজি প্রদেশদ্বয়কে নিয়ে মেকং নদীর অববাহিকায় অবস্থিত লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের জোট উপ-আঞ্চলিক জোটের একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ। এ উপ-আঞ্চলিক জোট ইতিমধ্যে মেকং নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ঈর্ষণীয় ভূমিকা রাখছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সার্ক যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে গঠিত হয়েছিল তা অনেকটা ব্যর্থ হওয়ায় এবং এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে দেখা দিয়েছে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর বা আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক জোট। দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভূটান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য ও নেপালকে (বিবিআইএন) নিয়ে অবাধ বাণিজ্য, বিদ্যুত্, পরিবহন এবং সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ১৯৯৭ সালে একটি উপ-আঞ্চলিক জোটের ধারণা আসে। কিন্তু দীর্ঘদিন নানা জটিলতায় বিবিআইএন-এর কোনো অগ্রগতি না হলেও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভূটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট (বিবিআইএন-এমভিএ) চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী বাস-ট্রাকের শর্তসাপেক্ষে অবাধ চলাচল এ অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। সড়কপথে মোট ৭টি রোডের মাধ্যমে জোটভুক্ত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে পণ্য ও যাত্রীবাহী বাস-ট্রাকের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারবে। ভারত বাংলাদেশ রোড কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা, আগরতলা-চট্টগ্রাম; ভূটান-ভারত-বাংলাদেশ রোড জংঘার-গোয়াহাটি-শিলং-তামাবিল-চট্টগ্রাম অন্য রোডটি থিম্পু থেকে ভারতের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম এবং নেপালের কাঠমুন্ডু হয়ে ভারতের শিলিগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগ সম্ভব হবে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর ৪৯ শতাংশ বাণিজ্য বিবিআইএন এরিয়ায় হয়ে থাকে। এই রোডগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য আরো প্রসারিত হবে। নেপাল ও ভূটান ল্যান্ডলক দেশ হওয়ায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ভারতের কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারবে। ভারত আসামে পণ্য যাতায়াতে ট্রানজিট সুবিধা ভোগ করবে অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়কপথে নেপাল ও ভূটানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ভারতকে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এরফলে ট্রান্সশিপমেন্ট চার্জ ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা বেশি অর্জিত হবে। বিবিআইএন-এ অঞ্চলে অধিক আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং ভারতের ৮টি রাজ্যসহ তিন দেশেই কর্মসংস্থান বাড়বে। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে বাণিজ্য ঘাটতি আছে অনেকাংশে সেটাও পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। যেহেতু বিবিআইএন একটি উপ-আঞ্চলিক জোট তাই আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানিতে সকল ধরনের ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি নিরসন করবে এবং জোটভুক্ত সকল দেশ নিজেদের মধ্যে শুল্ক ছাড়া বাণিজ্য সুবিধা ভোগ করতে পারবে।

বিদ্যুত্ ঘাটতির জন্য আমাদের দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যথেষ্ট শিল্পায়ন হচ্ছে না। তাই বর্তমানে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ আমদানি করছে এবং ভারতের সহায়তায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল কয়লা বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে নেপাল থেকে বিদ্যুত্ রপ্তানির চিন্তা পুরোনো কিন্তু ভারতীয় নীতির জন্য বিদ্যুত্ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। নেপালের জলবিদ্যুত্ আমদানিতে বাংলাদেশের দাবি অনেকদিনের। কিন্তু ভারতীয় মালিকানাধীন বিদ্যুত্ কেন্দ্রের বিদ্যুত্ ভারত ছাড়া অন্যকোনো দেশের কাছে নেপাল রপ্তানি করতে পারতো না। বিবিআইএন-এ ভারত তার পুরোনো নীতি থেকে সরে এসেছে এখন।

বিবিআইএনভুক্ত এরিয়ায় রয়েছে পাথর, কয়লা, গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ, এ সম্পদের উদ্বৃত্ত অংশ নিজেদের মধ্যে সহজে ও স্বল্পব্যয়ে আমদানি রপ্তানি করতে পারবে। চারটি দেশ একই অঞ্চলে অবস্থিত বলে এক দেশের কৃষ্টি কালচার সহজেই অন্য দেশের মানুষ জানতে পারবে। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস স্থাপিত হলে সীমান্তে অপরাধ ও নিরাপত্তার জন্য বাজেট কমে যাবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সেভেন সিস্টারস রাজ্য নিয়ে বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটানের বিবিআইএন উপ-আঞ্চলিক জোট বা বহুপাক্ষিক চুক্তি কার্যকর হলে সত্যিকার অর্থে এ অঞ্চলের মানুষের অবাধ যাতায়াতের ফলে বাণিজ্যের নতুন দ্বার খুলে যাবে, বিশ্বের অন্যান্য অর্থনৈতিক করিডোরের মতো দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি করিডোর উন্মুক্ত হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়