সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চেক ডিজঅনার মামলার লাভ-ক্ষতি

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ২২:০৫

চেক ডিজঅনারের মামলা আর করা যাবে না-হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব না পাওয়া গেলেও আইন বিশ্লেষক ও ব্যাংকাররা বলছেন ব্যাংক ঋণের বিপরীতে যে ব্ল্যাংক চেক রাখে তার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। এই রায়ে সেটা বন্ধ হবে যা ইতিবাচক।

তারা বলছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলে অর্থ ঋণ আদালতে মামলার বিধান আছে। আর ঋণের বিপরীতে তো জামানত দিতে হয়। কিন্তু ব্যাংকগুলো অধিক নিরাপত্তার জন্য ব্ল্যাংক চেক রাখে। ফলে ব্যাংক অর্থঋণ আদালত ও চেক ডিসঅনার এই দুই ধরনের মামলা করতে পারে। কিন্তু ব্যাংক চেক রেখে সেখানে টাকার অংক বসিয়ে তা ডিঅনার করিয়ে মামলা করা সংবিধান ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে ব্যাংক ও ব্যক্তি পর্যায়ে প্রতারণার সুযোগ থাকে।

ছবি: ডয়চে ভেলে

হাইকোর্টে বিচারপতি মো. আশরাফল কামালের একক বেঞ্চ বুধবার তার পূর্নাঙ্গ রায়ে ব্যাংকসহ কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখন থেকে চেক ডিজঅনারের মামলা করতে পারবেনা বলে আদেশ দিয়েছেন। হাইকোর্ট এই রায়ের পাশাপাশি চেক ডিজঅনারের সব ধরনের মামলা স্থগিত রাখতে বলেছেন।

মূল সমস্যা ব্ল্যাংক চেক

যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘এখানে মূল সমস্যা হলো হলো ব্ল্যাংক চেক। ব্যাংকগুলো যেকোনো ক্ষেত্রে ব্ল্যাংক চেক রেখে দেয়। এই প্র্যাকটিসটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ব্যাংকের হাতে ঋণের বিপরীতে দুইটি হাতিয়ার থাকে ব্ল্যাংক চেক এবং জামানত। কিন্তু ব্ল্যাংক চেক আইন ও সংবিধান সমর্থন করে না। আদালত সুশাসনের কথা ভেবে এই রায়টি হয়তো দিয়েছেন।’

অন্যদিকে এই চেক ডিজঅনারের মামলা আর করতে পারায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ে ক্ষতির মুখে পড়বে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অসুবিধার দিক হলো আগে ব্যাংক সহজেই চেক ডিজঅনারের মামলা করে জেলে পাঠাতে পারত। এখন সেটা পাঠাতে পারবেনা। ব্যাংকগুলো ওটাকে সহজ মনে করত। কিন্তু এখন অর্থঋণ আদালতে যেতে পারবে। আর ব্যাংকগুলোকে এখন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে জামানতের বিষয়টি আরও ভালোভাবে দেখে ঋণ দিতে হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চেক নিয়ে নানা ধরনের প্রতারণার সুযোগ আছে। তবে আমাদের দেশে আইনের সুযোগ নিয়ে আরো অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারণার সুযোগ আছে।’

ব্যাপক প্রতারণা হয়

বাংলাদেশের আইনে চেক ডিজঅনার মামলায় শাস্তি হলো এক বছর মেয়াদ পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা চেকে বর্ণিত অর্থের তিন গুণ পরিমাণ অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর এই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে জরিমানার অর্ধেক টাকা জমা দিয়ে আপিল করতে হবে। এই মামলাটি জামিন অযোগ্য।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক বিচারক আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘চেক বলতে চেক দাতার লিখিত চেককেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাংক যে ব্ল্যাংক চেক রাখে তা কোনোভাবেই আইন সম্মত নয়। ব্ল্যাংক চেক রাখাও একটি অপরাধ। তার কথা,’ ব্যাংগুলো আসলে এই চেকের মামলা দিয়ে নিরীহদের হয়রানি করে। দেশে যারা বড় বড় ঋণ খেলাপি তাদের  বিরুদ্ধে আমরা কোনো চেক ডিজঅনারের মামলা দেখি না। তারা রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে ঋণ নেয়। আর ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়ার সময় ঠিকমত জামানত দেখে যেনতেনভাবে ঋণ দেয়। ফলে তারা অর্থ ঋণ আদালতে প্রতিকার তেমন পায় না। তারা যদি ঋণ দেয়ার নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করে তাহলে অর্থঋণ আদালতেই দ্রুত প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। মানুষকে জেলে পাঠানো নয়, অর্থ উদ্ধারই মামলার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।’

আর সিপিসির অর্ডার ৩৭ রুল-২ ব্যবহার করেও তাতে ডিজঅনার হওয়া চেকের টাকা দ্রুত উদ্ধার করা যায় বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, ‘এই চেক ডিজঅনারের মামলা নিয়ে অনেক প্রতারণা আছে। একজন চুক্তি করে আরেকজনের কাছ থেকে এক কোটি টাকা নিলো। সঙ্গে ব্ল্যাংক চেকও দিলো। ওই ব্যক্তি টাকা শোধের পরও ব্ল্যাংক চেকে টাকার পরিমাণ বসিয়ে ও তারিখ দিয়ে চেক ডিজঅনারের মামলা করতে পারে। কারণ ব্ল্যাংক চেকে স্বাক্ষর ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। এরকম অনেক মামলা হয়েছে।’

আইনের পরিবর্তন আনতে হবে

আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থ সংক্রান্ত আইনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক বলেন, ‘ব্যাংক ঋণের বিপরীতে জামানত নিচ্ছে। তার ওপর আবার ব্ল্যাংক চেক নিচ্ছে। এটার প্রয়োজন আছে কী না সেই বিতর্ক আগেই ছিলো। এখন হাইকোর্টের রায়ে বলা হলো চেক ডিজঅনারের মামলা করা যাবে না। ফলে ব্যাংক আর ব্ল্যাংক চেক নিতে পারবেনা। কোনো ক্ষেত্রেই ব্ল্যাংক চেক নেওয়া যাবে না।’

ছবি: আব্দুল গনি

তবে তিনি বলেন, ‘এর আগে আপিল বিভাগের একটি নির্দেশনা আছে ডিজঅনারের মামলা এবং অর্থ ঋণ আদালতের মামলা একসঙ্গে চলতে পারবে। তবে একটির রায় হলে অন্যটি চলবে না। এখন দেখা যাক হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে টেকে কী না। টিকলে আইনে পরিবর্তন আনতে হবে।’

কিন্তু এই চেক ডিজঅনারের মামলা নিয়ে অনেক হয়রানি ও প্রতারণা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতারণা বন্ধে হাইকোর্টের আদেশ কাজে দেবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এক ব্যক্তি তার বাড়ি বিক্রি করার জন্য আরেক ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলেন যে তিনি তিন মাসের মধ্যে বাড়িটি বিক্রি করে দিলে পাঁচ লাখ টাকা পাবেন। এজন্য তাকে আগাম চেক দেওয়া হলো। কিন্তু ওই ব্যক্তি তিন মাসের মধ্যে বাড়ি বিক্রি করে দিতে পারলেন না। অথচ উল্টো চেক ডিজঅনারের মামলা করে দিলেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে এখন সাড়ে পাঁচ লাখের মত চেক প্রতারণার মামলা বিচারাধীন আছে।

ইত্তেফাক/এএএম