শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নতুন সেনাপ্রধানে 'বেজার' ইমরান খান 

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ২৩:০১

পাকিস্তানের ক্ষমতাধর এই পদে কে বসছেন তা নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে বহু জল্পনার পর সাবেক সেনা গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া অবসরে যাচ্ছেন ২৯শে নভেম্বর। তার পাঁচদিন আগে বৃহস্পতিবার তার উত্তরসূরি নিয়োগ করা হয়।

জেনারেল মুনির বর্তমানে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে সিনিয়র জেনারেল এবং জেনারেল বাজওয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে তাকে দেখা হয়। তিনি দেশটির অত্যন্ত প্রভাবশালী আন্ত:বাহিনী গোয়েন্দা বিভাগ আইএসআইয়ের নেতৃত্বে ছিলেন।

পাকিস্তানে রাজনীতি এবং পররাষ্ট্র নীতিতে সবসময় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, এবং নতুন একজন সেনাপ্রধান এমন সময় আসছেন যখন দেশটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে বড় রকম সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান - যিনি এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হন- নতুন সেনাপ্রধানের নিয়োগ নিয়ে ইসলামাবাদে নতুন জোট সরকার এবং সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করেছিলেন।

রাজনীতির পাশাপাশি, পাকিস্তানকে এখন মারাত্মক এক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। রপ্তানি ক্রমাগত কমছে এবং সেইসঙ্গে দফায় দফায় বাড়ছে খাদ্যের দাম। কয়েকমাস আগে নজিরবিহীন এক বন্যা ছিল মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।

জেনারেল মুনির যখন ২৯শে নভেম্বর সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নেবেন তখন তিনিই হবেন বৈরি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রধান কাণ্ডারি। সেইসঙ্গে আফগানিস্তানের নতুন তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের হালও তাকে ধরতে হবে। কারণ অঘোষিতভাবে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ এখনও সেনাবাহিনীর হাতে।

পাকিস্তানের রাজনীতিকরা সেটা খুব ভালোভাবেই জানেন, মানেন এবং তা স্বীকারও করেন।

খুশি নন ইমরান 

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই কোনোভাবেই জে. মুনিরের নিয়োগ চাইছিল না। কারণ, আইএসআইয়ের প্রধান থাকাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরেই জে. মুনিরকে ঐ সংস্থার নেতৃত্ব ছাড়তে হয়েছিল বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

সে কারণেই পিটিআই যাতে সেনাপ্রধান পদে জে. মুনিরের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু না করে তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি নিজে লাহোরে গিয়ে ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলেন।

ইমরান খান হয়তো এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক না তুলতে রাজি হয়েছেন, কিন্তু তাতে করে সেনা নেতৃত্বের সঙ্গেই তার চলতি বিরোধ বন্ধ হবে সে সম্ভাবনা কেউ দেখছেন না।

"আমদের গণতন্ত্র দুর্বল," বিবিসিকে বলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল তালাত মাসুদ, "ফলে সেনাবাহিনী সবসময় ঐ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে।"

৭৫ বছর আগে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে সেনাবাহিনী তিনবার ক্ষমতা দখল করেছে। বিভিন্ন সময় মোট ৪০ বছর ধরে সরাসরি দেশ শাসন করেছে। মোট ছয়জনের একটি তালিকা থেকে জে. মুনিরকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

যদিও কাগজে কলমে পাকিস্তানে সেনাপ্রধান নিয়োগের একমাত্র ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু এই নিয়োগ নিয়ে সবসময় প্রধানমন্ত্রী এবং বিদায়ী সেনাপ্রধানের মধ্যে টানাপড়েন চলে।

এ দফায় ঐ টানাপড়েন ছিল আরও প্রকট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এ নিয়ে বিস্তর পরামর্শ করেছেন তার ভাই এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সঙ্গে, যিনি রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য এখন উন্মুখ।

শরীফের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইমরান খান সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। তার কথা, বর্তমান 'দুর্নীতিগ্রস্ত' সরকার প্রধানকে সেনাপ্রধান নিয়োগের অধিকার দেওয়া উচিৎ নয়।

তবে এটা একরকম ওপেন সিক্রেট যে ইমরান খান নিজে সেনাবাহিনী এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাহায্য নিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার জেরেই মূলত তাকে এপ্রিলে ক্ষমতা হারাতে হয়।

এরপর থেকে ইমরান খান রাজনীতিতে অতিরিক্ত নাক গলানোর জন্য খোলাখুলি সেনাবাহিনীর নিন্দা করে চলেছেন। এমনকি এ মাসের গোঁড়ার দিকে তার ওপর গুলির জন্য তিনি সেনাবাহিনীর শীর্ষ ক'জন কর্মকর্তাকে দায়ী করেন।

যদিও সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তবে ইমরান খানের সমর্থকরা বিশ্বাস করেন তাদের নেতা ও দলের বর্তমান দুর্দশার জন্য দায়ী সেনাবাহিনী।

ইত্তেফাক/এসআর