বুধবার, ২৬ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

হাসপাতালে শতভাগ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও স্যালাইন নিশ্চিতের কার্যক্রম শুরু

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ০৫:০০

সরকারি হাসপাতালগুলোতে চাহিদার শতভাগ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে এসব ওষুধের উৎপাদন শুরু হবে। এর ফলে রোগীদের হাসপাতালের বাইরে থেকে আর কোন ধরনের ওষুধ কেনার প্রয়োজন পড়বে না। 

এ প্রসঙ্গে এসেনশিয়াল ড্রাগ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. এহসানুল কবির জগলুল ইত্তেফাককে বলেন, এতে এদেশের দরিদ্র রোগীরা বেশি উপকৃত হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে হাসপাতালগুলোতে শতভাগ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সামগ্রী ও স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী এসেনশিয়াল ড্রাগকে আধুনিক করার উদ্যোগ নেন। তারই অংশ হিসাবে এই আধুনিক প্ল্যান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্ল্যান্টে সব ধরনের ভ্যাকসিন তৈরির অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

ছবি: সংগৃহীত

অভিযোগ রয়েছে, দেশের অনেক চিকিৎসক ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে নানা ধরনের উপঢৌকন নিয়ে বিভিন্ন ওষুধ প্রেসক্রাইব করে থাকেন। অতিসম্প্রতি একজন নামীদামী চিকিৎসক একটি ওষুধ কোম্পানি থেকে মার্সিডিজ গাড়ি উপহার নিয়েছেন। এ ঘটনা চিকিৎসকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কয়েকজন চিকিৎসক বলেছেন, এ ধরনের গুটিকয়েক চিকিৎসকের জন্য পুরো চিকিৎসক সমাজের সম্মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অথচ করোনার সময় আমরা জীবন বাজি রেখে মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছি। তারা বলেন, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের অনেকগুলোই হয়ত দরিদ্র মানুষের পক্ষে ক্রয় করা সম্ভব হয় না। অথচ ওই ওষুধগুলোর সরবরাহ হাসপাতালে রয়েছে। রোগ পরীক্ষা নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের অরাজকতা চলছে। অনেক ডাক্তার লম্বা একটি তালিকা রোগীকে ধরিয়ে দেন প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য। অথচ সরকারি হাসপাতালে এসব পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। উচ্চমূল্য দিয়ে বাইরে এসব টেস্ট করতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের পক্ষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিতে এসে সর্বস্বান্ত হতে হয়। রাজধানী থেকে জেলা ও উপজেলা পর্যন্ত একশ্রেণীর দালাল বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সক্রিয় রয়েছে যারা রোগীদের বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে ভাগিয়ে নিয়ে যায়।

ছবি: সংগৃহীত

সরকারি হাসপাতালে এসেনশিয়াল ড্রাগ চাহিদার ৯০ ভাগ ওষুধ সরবরাহ করে আসছে। এর মধ্যে এন্টিবায়োটিক, গ্যাস্টিকের ওষুধ, ইনজেকশন, পেইন কিলারসহ নানা ওষুধ রয়েছে। জীবন রক্ষাকারী স্যালাইন তৈরি করতে গোপালগঞ্জে এই কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত এসেনসিয়াল ড্রাগের ওষুধ তৈরির অবকাঠামোটি অনেক পুরনো। এখন আধুনিক পদ্ধতিতে ওষুধ তৈরির সব কার্যক্রম চলবে মানিকগঞ্জে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন অবকাঠামো তৈরির জন্য ৩১শত একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে মানিকগঞ্জে। এ জন্য ব্যয় হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় এখানে সব ধরনের ওষুধ তৈরি করা হবে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক কারখানার অবকাঠামো তৈরির জন্য দিয়েছে ২৫০ কোটি ডলার এবং সরকার দিয়েছে ৫০ কোটি ডলার। এই অবকাঠামো স্থাপনের কাজটি করবে ফিনল্যান্ডের কোম্পানি ইল্যুম্যাপিক। গোপালগঞ্জে যে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে সেখানে ভ্যাকসিন তৈরির প্ল্যান্ট তৈরি করবে ফিনল্যান্ডের ওই কোম্পানি। সরকারি দরপত্রে অংশগ্রহণ করে তারাই প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। করোনা ভ্যাকসিনসহ যে কোন ভাইরাসের ভ্যাকসিন এখানে তৈরি করার সক্ষমতা থাকবে। এসেনসিয়াল ড্রাগের এমডি বলেন, পৃথিবীতে যে ধরনেরই ভাইরাস আসবে তার ভ্যাকসিন এখানে প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। এজন্য সেখানে থাকছে আধুনিক মানের গবেষণার ব্যবস্থা। অ্যান্টিবায়েটিক হতে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন হবে মানিকগঞ্জ প্ল্যান্টে। আর স্যালাইন, জন্মনিরোধক বড়ি ও ইনজেকশন উৎপাদন হবে গোপালগঞ্জ প্ল্যান্টে। জুন মাস থেকে এই প্ল্যান্টে উৎপাদন শুরু হবে।

ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রধান সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরকার বেশ কিছু ওষুধ সরবরাহ করে থাকে রোগীদের জন্য। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দু’একটি ওষুধ ছাড়া অন্য কোন ওষুধ রোগীদের দেওয়া হয় না। এখন সরকারের উদ্যোগে নতুন এসব প্ল্যান্টে উৎপাদিত ওষুধ সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীরা পাবেন। ওই ওষুধে হাসপাতালগুলোর শতভাগ চাহিদা মিটবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, সরকারের এই উদ্যোগ খুবই ভাল। সাধারণ মানুষের জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই ব্যবস্থাপনায় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা গ্রহণ করেই বাড়ি ফিরতে পারবে। রোগীর অর্থ ব্যয় হবে না। এটা সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই এই চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। তবে সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে ওষুধ পাচার বন্ধে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এক শ্রেণীর দালাল ও হাসপাতালের অসাধু কর্মচারীরা এ কাজে জড়িত। প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দু’একজনকে ধরে। কিন্তু তাতে কোন ফল হয় না। কিছুদিন পর আগের মতই অবস্থা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জন কার্যালয় এই ওষুধ পাচার ও অব্যবস্থাপনা রোধে কোন ভূমিকাই রাখতে পারছে না। কারণ প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। শতভাগ ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতের কার্যক্রম এই দুর্নীতিবাজদের কারণে কতটুকু সফল হবে বলে তা নিয়ে ডাক্তাররা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ওষুধ যাতে রোগীরা ঠিকমত পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থাপনা চালু রাখা দরকার।

ইত্তেফাক/এমএএম