শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঈশ্বরদীতে ঋণের মামলা

কারাগারে ১২ কৃষক: গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া আরও ২৫ জন

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৯:০৪

সমবায় ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে ঈশ্বরদীর ১২ কৃষককে কারাগারে পাঠানোর পর বাকি ২৫ জন কৃষক গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে রয়েছেন। ঈশ্বরদীর ছলিমপুর ইউনিয়নের ভাড়ইমারি গ্রামের ৩৭ কৃষকের পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় দিন পার করছেন। কীভাবে আদালতের মাধ্যমে জামিন করাতে হয়, অধিকাংশ পরিবারই তা জানেন না।

সরেজমিনে গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ গ্রেফতার এড়াতে ঘরছাড়া। বাড়িতে যারা আছেন তারাও কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন।

গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মামলায় অভিযুক্ত হতদ্ররিদ্র কৃষকেরা ভাড়ইমারি উত্তরপাড়ার সবজি চাষি সমবায় সমিতির সদস্য। সমিতির মাধ্যমেই ২০১৬ সালে সমবায় ব্যাংক থেকে গ্রুপভিত্তিক তারা ঋণ নেন। ঋণের টাকা অনেকেই পরিশোধ করেছেন দাবি করলেও পরিশোধের কাগজপত্র তাদের কাছে নেই।

কৃষকরা জানান, তারা সকলে পড়ালেখা না জানা মানুষ। মাঠে কাজকর্ম করেই দিন যায়। বিষয়টি অনেকেই ভুলেই গিয়েছিলেন। কৃষকদের গ্রেফতারের পর বিষয়টি সামনে আসে।

গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া কৃষকের বাড়ি। ছবি: ইত্তেফাক

গ্রেফতার হওয়া কৃষক রজব আলীর স্ত্রী বুলিয়া খাতুন, আতিয়ারের স্ত্রী রেশমা, মহির উদ্দিনের স্ত্রী বুলিয়া বেগমসহ বেশ কয়েকজন জানান, যদি ঋণখেলাপি হবে, তাহলে তাদের কেনো নোটিশ দেওয়া হয়নি? এ মামলায় আদালতের কোনো সমনও পাওয়া যায়নি। উল্টো ওয়ারেন্ট বের করে রাতের আঁধারে এসে গ্রেফতার করা হয়েছে।

কৃষক পরিবারের সদস্যরা আরও জানান, আইন-আদালত তারা বোঝেন না। পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের ছাড়ানোর জন্য স্থানীয় ইউপি সদস্যেরে কাছে গিয়েছিলেন। তিনি ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ করে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন।

সবজি চাষি সমবায় সমিতির সভাপতি ও ছলিমপুর ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য বিলকিস নাহার বলেন, মোট ১৬ লাখ টাকা ঋণের বরাদ্দ ছিলো। এ ঋণ ৩৭ জনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। তবে কেউ কম, আবার কেউ বেশি করে নেয়। ৭ জন বাদে ঋণের টাকা অনেকেই পরিশোধ করেছেন। আবার কারও কারও ২ থেকে ৫ হাজার বাকি আছে। তবে সাতজন কৃষক টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। ফলে গ্রুপভিত্তিক ঋণের কারণে সকলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যারা টাকা পরিশোধ করেছেন, তাদের অনেকের কাছেই পরিশোধের রশিদ নেই। দ্রুত সকল কৃষকের জামিনের ব্যবস্থার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের এক শিক্ষক বলেন, 'আমরা যতটুকু শুনেছি, সেটা হলো ১৬ লাখ টাকা ঋণ নিলেও কৃষকরা ১৩ লাখ টাকা আগেই পরিশোধ করেছেন। এরপরও নাকি ১২ লাখ টাকা পাওনা আছে মর্মে সমবায় ব্যাংক মামলাটি দায়ের করে! সমিতির সদস্যদের বর্তমানে এতো টাকা পরিশোধ করার মতো সামর্থ্য আছে বলে আমার মনে হয় না।'

গ্রেফতার আতঙ্কে ঘরছাড়া কৃষকের বাড়ি। ছবি: ইত্তেফাক

ছলিমপুরের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বাবলু মালিথা বলেন, বিষয়টি যদিও কষ্টের, তবুও নিয়মানুযায়ী ব্যাংক কাজ করেছে। বিষয়টি আমাদেরও জানা ছিলো না। আমি ওই ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যকে অতি দ্রুত একজন আইনজীবী নির্ধারণ করার কথা বলেছি।

গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় পুলিশের ভয়ে লোকজন হয়তো পালিয়ে আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমি নিজেও থানার ওসির সাথে কথা বলেছি। লেখাপড়া না জানা এসব কৃষক আইন-আদালতকে ভয় পায় বলেই এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অরবিন্দ সরকার জানান, আদালতের আদেশের ভিত্তিতে ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কৃষকেরা ঋণের টাকা পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেছেন।

ওসি বলেন, সমিতির গ্রুপ লিডার স্থানীয় নারী মেম্বার বিলকিস বেগম ঘটনার মূল হোতা বলে জেনেছি। তিনিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

সমবায় ব্যাংক পাবনা শাখার ম্যানেজার কাজী জসিম উদ্দিন জানান, তৎকালীন ম্যানেজার সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদ বাদী হয়ে ২০২১ সালে ব্যাংকের পক্ষে আদালতে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে।

এ বিষয়ে মামলার বাদী সৈয়দ মোজাম্মেল হক মাহমুদকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। বর্তমানে তিনি নাটোর শাখায় কর্মরত রয়েছেন। মামলার তারিখে এসে আদালতে হাজিরা দিয়ে যান।

এদিকে কৃষকদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) রোববার (২৭ নভেম্বর) বিকেলে শহরের এক নম্বর গেট এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ আহ্বান করেছে। বাংলাদেশ কৃষক সমিতিও এই প্রতিবাদ সমাবেশে একাত্মতা প্রকাশ করবেন বলে সমিতির জেলা সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব ইত্তেফাককে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে ভাড়ইমারী উত্তরপাড়া ভূমিহীন কৃষকদের নামে সমবায় ব্যাংকের পাবনা শাখা থেকে ওই গ্রুপ ঋণ নেওয়া হয়। ঋণখেলাপির মামলায় পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালত গত বুধবার ভাড়ইমারি গ্রামের ৩৭ জন প্রান্তিক কৃষকের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করেন। পরে পুলিশ শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ১২ জন কৃষককে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়।

ইত্তেফাক/এসকে