ছেলে আমার মস্ত মানুষ...

আপডেট : ১৫ জুন ২০১৯, ২২:৪৫

 ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ, মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার। নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামি দামি, সবচেয়ে কমদামি ছিলাম একমাত্র আমি। ছেলের আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম, আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম...।’  নচিকেতার সেই বিখ্যাত গানটির কথা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। অনেককেই জীবনের এই রূঢ় বাস্তবতা মেনে নিতে হয়েছে। তবে প্রশ্নটা থেকেই যায়— বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি কি সত্যি আমরা কর্তব্য পালন করছি? 

বিশ্ব প্রবীণ নিপীড়ন সচেতনতা দিবস গতকাল শনিবার পালন করা হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ১৫ জুন আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্ব সহকারে দিবসটি পালিত হলেও দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে তা হয়নি। বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ লোকের সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রবীণদের ওপর নিপীড়নের হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ভয়াবহ সমস্যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে, যা তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ কারণে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। প্রবীণদের ওপর যে নিপীড়ন হচ্ছে, সেটা অনেক সময় অদৃশ্যমান থেকে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্য কিংবা প্রাণপ্রিয় সন্তানের দ্বারাই বেশিরভাগ সময় প্রবীণরা নির্যাতিত ও তাদের অবহেলার শিকার হন। সন্তানরা এক কাপড়ে বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, এমন ঘটনাও সমাজে ঘটছে। এমন হতভাগ্য প্রবীণ ব্যক্তিদের শেষ আশ্রয়স্থল বৃদ্ধাশ্রম।

‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে। একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু...। মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে। একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না? ও বন্ধু...।’ ভূপেন হাজারিকার সেই মানবতার গান শুনে অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। আশ্রয়হীনদের বিনা মূল্যে ভরণ-পোষণের জন্য গাজীপুর সদরের হোতাপাড়া বিশিয়া-কুড়িবাড়ী মনিপুর এলাকায় বেসরকারিভাবে গড়ে উঠেছে বয়স্ক পুনর্বাসনকেন্দ্র। শত শত অসহায় বয়স্ক মানুষের পদচারণায় ওই পুনর্বাসনকেন্দ্রটি এখন মুখরিত। এই বৃদ্ধাশ্রমে ২০০ জন পুরুষ ও মহিলা আছেন। বর্তমানে সেখানে ৯০ জন মহিলা ও ৯৬ জন পুরুষ রয়েছেন। বাকি ১৪ জন স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে গেছেন। এদের তিনজন মহিলা ও ১১ জন পুরুষ। এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকা কয়েকজন ইত্তেফাককে বলেন, ‘বড় হওয়া’ সন্তানকে দুনজর দেখলে প্রাণ জুড়ায় বৃদ্ধ মা-বাবার। উত্সবের দিনগুলোতে আরো বেশি করে কাছে পেতে ইচ্ছে হয় তাদের। কিন্তু বৃদ্ধ মা-বাবার সেই ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই সমাজে ‘প্রতিষ্ঠিত’ সন্তানদের। পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা পূজার দিনে বৃদ্ধ মা-বাবা বুকে পাথর চেপে বসে থাকেন আশ্রমের ঘরে। অথচ ৩০ বছর আগে পিঁপড়ায় কামড়াবে বলে মা-বাবা সেই সন্তানকে মাটিতে নামতে দিতেন না। স্কুল-কলেজ কিংবা চাকরি শেষে সোনামণি কখন বাড়ি ফিরবে, কী খাবে এসব চিন্তায় পথ চেয়ে থাকতেন তাঁরা। নিজেরা না খেয়ে সন্তানের পছন্দের খাবারটা তুলে রাখতেন অতি যত্ন করে। কোন জামা-জুতা পরলে তাদের মানাবে তা কিনে দিতেন সব সময়। সন্তানদের একটু কষ্ট হলে হূদয় ভেঙে যায় বাবা-মার। সন্তানকে নিয়ে তাঁদের কতই-না স্বপ্ন। সময়ের চাকা ঘুরে বড় হয়েছে সন্তান। ভালো চাকরি করে। বিয়েও করেছে। নিজেরাই আলাদা সংসার গড়েছে। সেই সংসারে ‘বৃদ্ধ’ মা-বাবার কোনো জায়গা হয় না। ১ হাজার ৫০০ স্কয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে পাঁচ ফুট লম্বা দুজন মানুষের স্থান হয় না।

বাবা-মায়েরা আজ বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। খাবারটা পর্যন্ত নিজ হাতে তুলে খেতে পারেন না। কাপড় ঠিক রাখতে পারেন না। বাথরুমে যেতেও তাঁদের অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। তাঁরাই এখন শিশু হয়ে গেছেন। তাঁদের প্রয়োজন আপনজনদের সাহায্য। কিন্তু কে শুনবে তাঁদের মনের কথা। সবাই যে আজ বড়ই ব্যস্ত। মা-বাবার কথা মনে রাখার সময় কোথায় এই বিংশ শতাব্দীতে। নিজের সাজানো সেই সোনার সংসারে তাঁরা মূল্যহীন, অবাঞ্ছিত। অবহেলা আর নানা গঞ্জনা নিত্যসঙ্গী তাদের। অবহেলা সহ্য করতে না পেরে নীরবে কেঁদেছেন দিনের পর দিন। এসব কষ্ট আর যাতনা সইতে না পেরে একসময় তাঁরা অন্যত্র আশ্রয় খোঁজেন। অনেক ‘ধনী’ সন্তানও ‘অসহায়’ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেন।

অবসরপ্রাপ্ত একজন নির্বাচন কর্মকর্তা দুই বছর ধরে গাজীপুরের বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। বয়সের ভারে এখন আর সহজে চলাচল করতে পারেন না, অনেক কষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘ধনী ছেলের ঘরে আমার ঠাঁই হয়নি। বাড়ি থেকে আমাকে বের করে দিয়েছে। প্রথম দুই বছর মেসে ছিলাম। পরে মসজিদের একজন ইমাম আমাকে এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান।’ বিমানের একজন সাবেক এক কর্মকর্তাও এক বছর ধরে এই বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। তাঁকেও বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তাঁর একটিমাত্র মেয়ে, উচ্চশিক্ষিত। হঠাত্ একদিন তিনি স্ট্রোক করলে স্ত্রী ও মেয়ে তাঁর সব সম্পদ লিখে নিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। এক পর্যায়ে ওই কর্মকর্তা এই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেন। সেখানে গত দুই বছর ধরে আছেন তিনি। গাছের ছায়ায় বসে বই পড়ে, গান শুনে তাঁর ভালোভাবেই সময় কেটে যাচ্ছে।