শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

প্রকৃত মানুষ হবার চর্চা!

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১২:৪৩

কেউ পিতা-মাতার পা ধুয়ে দিচ্ছে, কেউ টিস্যু দিয়ে মুছে দিচ্ছে পা। সন্তানরা যত্নসহকারে পিতা-মাতার পা স্পর্শ করে ময়লা পরিষ্কার করছে। কেউবা মাতা-পিতাকে চুমু খাচ্ছে, আলিঙ্গন করছে। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের এমন মহৎ কর্ম দেখে চোখ দিয়ে ঝরছে অশ্রু অভিভাবকদের। পাশ থেকে শিক্ষার্থীদের পানিসহ টিস্যু এগিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকরা। একটু দূর থেকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ তা অবলোকন করছে। প্রায় ৩ হাজার পিতা-মাতার সম্মেলনে এমন আবেগঘন ও মমতাময়ী অনেক পর্ব ছিল এ অনুষ্ঠানে।

শনিবার দিনব্যাপী ‘প্যারেন্টস ডে’ উপলক্ষে এমন দৃশ্য ঘটে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট অব লিভিং কোর্সের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় এ ‘প্যারেন্টস ডে’।

ছবি: সংগৃহীত

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে মা–বাবাদের প্রত্যক পর্বে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কেউ গেয়েছেন গান, কেউবা নাচ বা অভিনয়, আবার ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিচারণা। মা-বাবা ও সন্তানের মিলে গলা মিলিয়েছেন অসংখ্য গানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিরেক্টর অব স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমানের সঞ্চালনার প্রত্যেক বাঁকে ছিল আকর্ষণ ও আত্মিক বন্ধনের টান।

ভোলা থেকে এসেছিলেন অভিভাবক শহিদুল ইসলাম। শারীরিকভাবে অসুস্থ তিনি। ডান পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারেন না। একবছর আগে স্ট্রোক করেছিলেন। এতে, ডান পা প্যারালাইজড হয়ে যায়। এখন আগের থেকে একটু সুস্থ। এজন্য এ আয়োজনে এসেছিলেন তিনি। ‘প্যারেন্টস ডে’তে এসে তিনি বলেন, অনুষ্ঠানে আসতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। সঙ্গে আমার স্ত্রীও আছে। আর্ট অব লিভিং কোর্সের শিক্ষার্থীদের এমন মহৎ কর্ম দেখে আমি অনেকটু সুস্থ বোধ করছি এখন। সন্তানরা এমন ভালো অনুশীলনের মধ্যে থাকলে, কোনো সন্তানকে নিয়ে বাবা-মা আর দুঃশ্চিন্তা করবে না। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, এমন আয়োজন বা অনুশীলন করা সন্তানরা মাদকাসক্ত হবে না। দেশের যুব সমাজ আজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। তাই এমন চর্চা সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হওয়া এখন সময়ের দাবি।

ছবি: সংগৃহীত

জয়নুল আবেদীন বাবলুর মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে পড়ে। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলেন, এমন কর্মকাণ্ড নিঃসন্দেহ মানুষদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। এখন যোগ্য মানুষের অভাব নেই তবে প্রকৃত মানুষের অভাব রয়েছে পৃথিবীতে। এ সন্তানরা মানুষ হবার চর্চার মধ্যে রয়েছে। তার দাবি, তবে আগামী দিন থেকে, আমাদের সামনে আগে শিক্ষকদের পা ধুয়ে দেবে শিক্ষার্থী এমন দৃশ্য দেখতে চাই।

লালমনিরহাট  জেলা থেকে এসেছিলেন আকলিমা বেগম, আজ আমি খুব আনন্দিত, আমার জীবনে আর কোনো চাওয়া–পাওয়া নেই। আমার সন্তান দীর্ঘদিন ধরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অনুষ্ঠানে আসার পর আমার সন্তান আমাকে জড়িয়ে ধরে শপথ নিয়েছে, মা-বাবাকে আর কোনো দিন কষ্ট দেবে না। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে! আমি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে বলব, দেখো এখনকার প্রজন্ম নাকি পিতা-মাতাকে সম্মান করে না। দেখো যাও তোমরা, আমাদের সন্তানরা শুধু সম্মানই করে না! পা ধুয়ে দেয়, দায়িত্ব দেন। এ অনুষ্ঠান তার জীবন্ত উদাহরণ।

ছবি: সংগৃহীত

‘প্যারেন্টস ডে’ আসা প্রতিটি অভিভাবক একটাই কথা বলেছেন যে, দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। শিক্ষিত হবার আগে মানুষ হওয়া জরুরি সবার। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট অব লিভিং ডিসিপ্লিন এমন শিক্ষা দেবার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, আমি অভিভূত। সন্তান পিতা-মাতার পা ধুয়ে দিচ্ছে এমন দৃশ্য এখন সচারচর চোখে পড়ে না। এখনকার প্রজন্ম স্মার্ট ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ আছে। তবে পিতা-মাতাকে সম্মান করা সন্তানও হারিয়ে যায়নি এ অনুষ্ঠান দেখে বোঝা যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন চর্চা থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ছবি: সংগৃহীত

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ সংস্কৃতির ওপর ভর করে আগামীর বিশ্বকে নেতৃত্ব দিবে এমন পরিকল্পনা নিয়ে এখন কাজ করছি আমরা। এজন্য সততার পাশাপাশি বিনয় ও দক্ষ মানুষ হওয়া দরকার আমাদের বলে অনুষ্ঠান শেষ করেন ডিআইইউর চেয়ারম্যান ড. মো. সবুর খান।

ইত্তেফাক/বিএএফ