রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২১ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জালিয়াতি করে পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখলে নেন সালাম মুর্শেদী

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৭:০৩

বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাবেক ফুটবলার আব্দুস সালাম মুর্শেদী এমপি গুলশানের যে বাড়িতে বাস করছেন সেই প্লটটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি। সেই পরিত্যক্ত সম্পত্তি (প্লট) দখলে নিতে নেওয়া হয়েছে নানা চতুর কৌশল। সৃজন করা হয়েছে নানা নথি। এমনকি ওই প্লটটি প্রকৃতপক্ষে যে সড়কে অবস্থিত সেই সড়ক নম্বরও বদলে ফেলা হয়েছে ওই সৃজনকৃত নথিতে। যার ফলে গুলশান আবাসিক এলাকায় রাজউকের লে-আউট নক্সায় কথিত বাড়ির অস্তিত্ব নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চিঠির প্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত তিন সদস্যের কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। একইসঙ্গে ওই তদন্ত কমিটি প্লটটি অবিলম্বে সরকারের দখলে নিতে সুপারিশ করেছে।

কমিটি বলছে, গুলশান আবাসিক এলাকার ১০৪ নং রাস্তার সিইএন(ডি) ব্লকের ২৭ নম্বর বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি। ওই পরিত্যক্ত সম্পত্তি তালিকা হতে অবমুক্ত ব্যতিরেকে যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তার বৈধতার বিষয়ে সুস্পষ্ট দালিলিক প্রমাণাদি অনুপস্থিত। সৃজন করা কাগজপত্রের আলোকে ওই বাড়িটি হস্তান্তর প্রক্রিয়া বিধিসম্মত হয়নি। এমতাবস্থায় অবৈধ দখলভুক্ত প্লটটি অবিলম্বে সরকারের দখলে আনা যেতে পারে। একইসঙ্গে পরিত্যক্ত এই সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলে নেওয়ার জন্য বিগত সময়ে সংঘটিত জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুপারিশ করেছে কমিটি।

প্রসঙ্গত, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অধিশাখা-৯ এর যুগ্মসচিব মো. মাহমুদুর রহমান হাবিবকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান ও সদস্য হিসেবে ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং শাখা-১১ এর উপসচিব জহুরা খাতুন। দুদকের চিঠির প্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত সেপ্টেম্বর মাসে এই কমিটি গঠন করে দেয়।  

প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে: কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে ওই প্লটটি সম্পর্কে বলা হয়েছে, তদন্ত কমিটি প্লটটি পরিদর্শনকালে দেখতে পায় যে প্লটটি গুলশান আবাসিক এলাকার ১০৪ ও ১০৩ নং রাস্তার সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি কর্নার প্লট। প্লটের সামনের বিভাজিত ২৭/বি অংশে একটি তিনতলা ইমারত বিদ্যমান। পিছনের বিভাজিত সিইএন(ডি)-২৭/এ প্লটটি বাউন্ডারি ওয়াল দ্বারা ঘেরা রয়েছে। এই প্লটের ফটকে কোন নামফলক নাই। প্লটটির উত্তরে সিইএন (ডি) ২৬ নং প্লট। দক্ষিণে ১০৩ নং রাস্তা, পশ্চিমে ১০২ নং রাস্তার ২ নং প্লট এবং পূর্বে ১০৪ নং রাস্তা বিদ্যমান। বর্ণিত প্লটটি পূর্বমুখী এবং প্লটের প্রবেশদ্বার ১০৪ নং রাস্তা সংলগ্ন পূর্ব দিকে অবস্থিত।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরেজমিন পরিদর্শন ও গুলশান আবাসিক এলাকার লে-আউট নক্সা পর্যালোচনায় রোড নং ১০৪ ও রোড নং ১০৩ এর সংযোগ স্থলের কর্নার প্লট/বাড়ির অবস্থান বিবেচনায় ২৭ নং প্লটটি ১০৪ নং রাস্তায় অবস্থিত। যা ১৯৮৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত ৯৭৬৪(১) নং পৃষ্ঠার ৪৬ নং ক্রমিকে ‘খ’ তালিকাভুক্ত পরিত্যক্ত বাড়ি। অর্থাৎ ঢাকার গুলশান আবাসিক এলাকার গুলশান সিইএন(ডি) ব্লকের ১০৪ নং রোডের ২৯ নং হোল্ডিংস্থিত ২৭ নং বাড়ি। সর্বশেষ জরিপ/সিটি জরিপে সংশ্লিষ্ট এলাকার সিইএন(ডি) ব্লকের ২৭ নং প্লটের ৫২০৪ ও ৫২০৫ দাগসমূহ সিটি জরিপের ৯ নং খতিয়ানভুক্ত যা সরকারের পক্ষে গণপূর্ত নগর উন্নয়ন বিভাগ ঢাকা এর নামে রেকর্ডভুক্ত।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মালেকা রহমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত  মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং -২৮ এর মূলে তার বরাবর প্রেরিত পত্রে জানানো হয় যে, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাড়ি নং-সিইএন (ডি) ২৭, হোল্ডিং নং-২৯, রোড নং-১০৩, ঢাকার বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির ‘ক’ ও ‘খ’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং অবমুক্তির কোন অবকাশ নাই।  এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটি বলেছে, বাস্তবে ওই এলাকায় রাজউকের লে-আউট নক্সায় কথিত বাড়ির অস্তিত্ব বিদ্যমান নাই। এক্ষেত্রে সুকৌশলে ওই এলাকার ১০৪ নং রোডে অবস্থিত উক্ত বাড়িটি ১০৩ নং রোড দেখিয়ে জাল-কাগজপত্র সৃজনপূর্বক হস্তান্তর-নামজারিসহ অন্যান্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিইএন(ডি) ২৭ নম্বর প্লটের মূল নথি পাওয়া যায়নি। যেসব নথি রয়েছে তার সবই ফটোকপি। সেই কাগজপত্র পর্যালোচনা করে কমিটি দেখতে পায় যে উক্ত প্লটটি ১৯৬০ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর ঢাকা রি-রোলিং মিলসকে বরাদ্দ দেয়া হয়। নথিতে থাকা কাগজে দেখা যায়, ১৯৬৯ সালের ২০ অক্টোবর বিক্রয় চুক্তিনামা মোতাবেক প্লটটি মালেকা রহমানের সঙ্গে বিক্রয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৫ সালে  মালেকা রহমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার সন্তান মীর মোহাম্মদ হাসান ও মীর মোহাম্মদ নুরুল আফছার দানসূত্রে এই প্লটের যৌথ লিজ গ্রহীতা হিসাবে গণ্য করা হয়। পরে এদের আবেদনের কারণে ১৯৯৭ সালে ৩১ মার্চ বিভাজিত প্লটের ২৭/বি সালাম মুর্শেদী বরাবর হস্তান্তরে অনুমোদন করা হয়। ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর তার আবেদনের প্রেক্ষিতে উক্ত প্লটটি হাসান ও নুরুলের পরিবর্তে হস্তান্তরসূত্রে সালাম মুর্শেদীর নামে নামজারি ও হস্তান্তরগ্রহীতা হিসাবে গণ্য করা হয়। পরে তার আবেদনে ২০০৪ সালে রাজউক ইমারত নির্মাণের জন্য নক্সা অনুমোদনের ছাড়পত্র দেওয়া হয় মুর্শেদীকে।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি আরো বলেছে, ঢাকা রি রোলিং মিলস এর নিকট হতে মালেকা বেগম/রহমান নামের ব্যক্তি বা উক্ত নামধারী ব্যক্তি হস্তান্তরসূত্রে/ক্রয়সূত্রে লীজ গ্রহীতা হিসাবে গণ্য করার স্বপক্ষে কোন বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে দুই পুত্রকে দানপত্র ও দানপত্রে মালেকা রহমানের স্বাক্ষর সিআইডি কর্তৃক ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। একইসূত্রে সালাম মুর্শেদী ও ইফফাত আরা হকের অনুকূলে সংশ্লিষ্ট বিভাজিত প্লট হস্তান্তর/নামজারি কার্যক্রম বাতিল বলে বিবেচিত।

এদিকে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে সালাম মুর্শেদীর বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

প্রসঙ্গত, প্লটটি বেআইনিভাবে দখল করার অভিযোগে সালাম মুর্শেদীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চেয়ে চিঠি দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। চিঠির জবাব না পেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। ওই রিটের প্রেক্ষিতে গত মাসে বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই প্লট ও বাড়ি সংক্রান্ত যাবতীয় নথি তলবের আদেশ দেয়। যদিও এখন পর্যন্ত উচ্চ আদালতে কোন বিবাদী এ বাড়ি সংক্রান্ত নথি দাখিল করেনি।

ইত্তেফাক/ইআ