জেলার শীর্ষ বিদ্যাপীঠ গাইবান্ধা সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া কলেজে সুরক্ষিত সীমানা প্রাচীর না থাকায় বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। স্নাতকোত্তর পর্যন্ত পড়ার সুযোগ থাকা এ কলেজটিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীও নেই। নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ। এসব কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে ১৩ একর জমিতে কলেজটি গড়ে ওঠে। কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ হাজার ৩৩৬ জন যার মধ্যে ছাত্র ৬ হাজার ৫৩৮ জন এবং ছাত্রী ৪ হাজার ৭৯৮ জন।
আবাসিক সংকট প্রকট :কলেজেছাত্রের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু ছাত্রাবাস নেই। তবে ১০০ শয্যার ছাত্রীনিবাস আছে। ছাত্রদের দাবির মুখে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি ১০০ শয্যার পাঁচ তলাবিশিষ্ট ছাত্রাবাস নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্মাণব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পঞ্চগড়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ ট্রেডার্স এ কাজের দায়িত্ব পায়। ঐ বছরের ৪ নভেম্বর কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর দেড় বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ছাত্রাবাসের মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো ভবনটি কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট প্রকট হয়ে উঠেছে।
সম্মান প্রথম বর্ষের ছাত্র আসিফ রায়হান বলেন, ‘রংপুর থেকে এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি। কলেজে ছাত্রাবাস নেই। থাকতে হয় আশপাশের মেসে। মেস ভাড়া অনেক বেশি। পরিবেশও ভালো না। নতুন ছাত্রাবাস নির্মিত হলেও সেটি চালু করা হয়নি। বিষয়টি স্যারদের জানিয়েও কাজ হচ্ছে না।
এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ মো. খলিলুর রহমান বলেন, ছাত্রাবাস নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কিন্তু বার বার তাগাদা দেওয়ার পরও হস্তান্তর করা হচ্ছে না। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদও বলেন, ভবনটি কলেজ কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তরে ঠিকাদারকে বার বার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। তিনি নানা অজুহাতে এটি হস্তান্তর করছেন না। কালক্ষেপণের জন্য ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি কেন, জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং পঞ্চগড় জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান শেখ বলেন, ‘আমার লাইসেন্সে গাইবান্ধার আনিছুর রহমান ছাত্রাবাসের নির্মাণকাজ করেন। ভবনটি হস্তান্তরের জন্য তাকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। প্রয়োজনে কাজ বাতিলের জন্য আমি নিজেই নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেব।’ তবে আনিছুর রহমান বলেন, ভবনের ভেতরে বৈদ্যুতিক কাজ বাকি আছে। তাই হস্তান্তরে বিলম্ব হচ্ছে। অচিরেই হস্তান্তর করা হবে।
ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতায় শিক্ষার্থীরা :ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের দৌরাত্ম্যের কারণে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বহিরাগত বখাটেরা ক্যাম্পাসে ঢুকে উচ্চশব্দে হর্ন বাজিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায়।
সম্মান প্রথম বর্ষের ছাত্র আলিফ হাসান জানায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে না। বহিরাগতরা প্রায়ই ক্যাম্পাসে এসে শিক্ষার্থীদের টাকা, মোবাইল ফোন ছিনতাই করে। কোনো ছেলের সঙ্গে কোনো মেয়েকে কথা বলতে দেখলেই তাদের হেনস্তা করে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলেন, কলেজ ক্যান্টিনে মেয়েদের যাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই। বহিরাগতরা সেখানে সবসময় আড্ডা দেয়।
সম্প্রতি এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে অধ্যক্ষ নিজেই লাঞ্ছিত হয়েছেন। এনিয়ে মামলা হলে একজনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। বহিরাগতদের দৌরাত্ম্য বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশও করেছেন। কিন্তু তারপরও ক্যাম্পাসে তাদের আনাগোনা, শিক্ষার্থীদের হেনস্তা কমছে না। অধ্যক্ষ বলেন, বহিরাগতদের বিষয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছে। গাইবান্ধা সদর থানার ওসি মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ক্যাম্পাসে পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মচারী সংকট : এনাম কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব কলেজে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর বিষয় আছে, সেসব কলেজে প্রতিটি বিষয়ের জন্য ১২ জন করে শিক্ষক থাকার কথা। এ হিসাবে এ কলেজে ১৪টি স্নাতক (সম্মান) বিষয়ের জন্য ১৬৮ জন, দুইটি স্নাতকোত্তর বিষয়ের জন্য আট জন এবং অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ মিলে ১৭৮ জন শিক্ষক দরকার। কিন্তু কলেজটিতে পদই আছে ৮২ জন শিক্ষকের। এই ৮২ জনের মধ্যে আবার ২২ জন শিক্ষকের পদই শূন্য। এছাড়া কর্মচারী দরকার ৪৮ জন, আছেন মাত্র সাত জন। অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষকসংকটের কারণে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ১১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শিক্ষকদের। প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষক চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। প্রতি মাসে তাগাদাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না।
অন্যান্য সমস্যা : সম্মান ২য় বর্ষের ছাত্রী হাবিবা খাতুন জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই কলেজের মাঠে প্রায় হাঁটু পানি জমে যায়। চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী উম্মে হাবিবা জানান, কলেজ লাইব্রেরিতে পর্যাপ্তসংখ্যক আসন ও পর্যাপ্ত বই নেই। একসঙ্গে ১০ জনের বেশি বসা যায় না। তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আসিফ আকন্দ বললেন, কলেজে ছাত্র সংসদের সভায় শিক্ষার্থীদের ছোট-বড় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ থাকে। আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যার সমাধানও করা যায়। অথচ দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে কলেজ অধ্যক্ষ বলেন, দেশের কোনো কলেজেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। তাই এখানেও বন্ধ আছে।
