৩২ বছর ধরে অচল রাকসু 

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯:২২

৩২ বছর ধরে অচল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। ধোঁয়াশায় কাটছে রাকসুর নির্বাচন। প্রতিবছর নির্বাচনের কথা উঠলেও দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে অচলাবস্থায় রয়েছে রাকসু। রাকসু সচল করার কোনো আন্তরিকতা চোখে পড়ে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। 

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কারণে নির্ধারিত ভবনে রাকসু নামটাও মুছে গিয়েছে। খসে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ভবনের রুমগুলো দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। অবস্থাটা এমন যে ‘জন্ম তাহার পরের লাগি’।

১৯৬২ সালে রাকসু যাত্রা শুরু করে। এ পর্যন্ত ১৪ বার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধই রয়েছে।

রাকসু চালু করতে বিভিন্ন সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। নানা সময় প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপ, অবস্থান কর্মসূচি, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, লিফলেট বিতরণ ও মাসব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দফায় দফায় দাবি জানিয়েছে তারা।

রাকসু নির্বাচন না হওয়ার পিছনে ছাত্র সংগঠনগুলো ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুই মেরুতে অবস্থান করছে। একদিকে যেমন ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের প্রস্তুত বলে দাবি করছে আবার প্রশাসনও নিজেদের প্রস্তুতির কথা বলছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। এরই মধ্যে অতিবাহিত হয়েছে ৩২ বছর। 

এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থানের অভাবকে দায়ী করে বলছে শিক্ষার্থীরা চাইলে যেকোনো সময় রাকসু নির্বাচন দিতে প্রস্তুত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছে, দীর্ঘদিন রাকসু নির্বাচন না হওয়ায় একদিকে যেমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার কেউ নেই অন্যদিকে রাকসুর অনুপস্থিতিতে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা জড়িয়ে পড়ছেন হলের সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে। এতে সৃষ্টি হচ্ছে নেতৃত্ব সংকট ।

রাবি ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি মহব্বত হোসেন মিলন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাকসু নির্বাচনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য হারানোর ভয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবসময় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না দেওয়ার চেষ্টা করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাণচঞ্চল ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস বিনির্মাণ করার জন্য রাকসু নির্বাচন অতি জরুরি। তাই সকল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে আমরা আবারও আন্দোলনে যাবো।

রাকসু আন্দোলন মঞ্চের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে রাকসু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। রাকসু কার্যকর না থাকায় শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকারের কথা বলতে পারছে না। সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন রাকসু চায় না। কারণ এখন তারা যেভাবে সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিতে পারছে, রাকসু সচল থাকলে তা আর পারবে না। তাই মূলত রাকসু নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাচনের দাবিতে আমরা আবারও আন্দোলন শুরু করেছি। ইতিমধ্যেই ১৪ দফা দাবি জানিয়েছি। আশা করি এবার রাকসু সচল করতে প্রশাসন সদিচ্ছার অভাব দেখাবে না।

উপ-উপাচার্য ড. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা রাকসুকে সচল করতে হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে পরামর্শের মাধ্যমে একটা পর্যায়ে আসতে হবে। রাকসু কার্যকর করার জন্য প্রশাসন সবসময় সচেষ্ট ও আন্তরিক। আমরাও চাই রাকসু নির্বাচনটা হোক। রাকসু নির্বাচন না হওয়ায় যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি দেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ এখান থেকেই তো ভবিষ্যতের নেতৃত্ব বের হবে।

১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৬-৫৭ মেয়াদে। তখন এর নাম ছিলো রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রাসু)। আইয়ুব খানের শাসনামলে শুরুতে এর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ১৯৬২ সালে পুনরায় যাত্রা শুরু করে রাকসু নামে। এখন পর্যন্ত ১৪ বার রাকসু নির্বাচন হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯-৯০ মেয়াদের জন্য। তবে স্বাধীনতার পর সামরিক সরকারগুলোর আমলে বিভিন্ন সময় বন্ধ ছিল রাকসু নির্বাচন।

ইত্তেফাক/বুখারী/পিও