রোববার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২২ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সেই ৩৭ কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চলছে ঋণখেলাপির তদন্ত

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬:৪৬

ঈশ্বরদীর ভাড়ইমারি গ্রামের ৩৭ কৃষকের ঋণখেলাপির বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তদন্ত করছেন।

সোমবার (৫ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় তদন্ত কমিটির তিন সদস্য এবং সমবায় ব্যাংক পাবনা শাখার কর্মকর্তারা ভাড়ইমারী উত্তরপাড়া সবজিচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি বিলকিস নাহারের বাড়িতে যান।

এ সময় উপস্থিত কৃষক আব্দুস সামাদ, মজনু প্রামানিক ও আতিয়ার রহমানের সাথে কথা বলেন। পরে কমিটির সদস্যরা ঋণখেলাপিতে অভিযুক্ত কৃষকদের বাড়িতে যান। তারা কৃষকদের কাছে জানতে চান, ঋণের টাকা কেন তারা পরিশোধ করা হয়নি, ঋণের কিস্তি পরিশোধের রশিদ আছে কিনা এবং কার কাছে তারা কিস্তির টাকা জমা দিয়েছেন। এছাড়াও মামলা দায়েরের আগে ব্যাংক তাদের ঋণ পরিশোধের কোনো নোটিশ দিয়েছে কিনা।

বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের ডিজিএম (পরিদর্শন) আহসানুল গণির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন উপ-ব্যবস্থাপক (পরিদর্শন ও আইন) আব্দুর রাজ্জাক ও সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রকল্প ঋণ) আমিনুল ইসলাম রাজীব।

ঋণের টাকা পরিশোধের বিষয়ে জানতে চাইলে কারাভোগের শিকার কৃষক আব্দুস সামাদ বলেন, সকল টাকা পরিশোধ করেছি। তারপরও কেনো আমাকে তিনদিন কারাগারে থাকতে হলো। এ দায়ভার ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। আমাদের হয়রানি করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, চল্লিশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে লভ্যাংশসহ পরিশোধ করেছি, এরপরও কারাগারে যেতে হয়েছে। এজন্য ব্যাংক কর্মকর্তারা দায়ী। যদি ঋণ পরিশোধ না করে থাকি, তবে কেনো আমাদের বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ পাঠানো হলো না। উকিল নোটিশ পাঠালেই জানতে পারতাম ঋণ পরিশোধ হয়নি। কোথায় সমস্যা রয়েছে, সেটা আমরা দেখতাম। কিন্তু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তা না করে সরাসরি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়ে দিলো। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।

ভাড়ইমারী উত্তরপাড়া সবজিচাষি সমবায় সমিতির সভাপতি বিলকিস নাহার জানান, ব্যাংকের মাঠকর্মীরা এসে কৃষকের কাছ থেকে কিস্তি গ্রহণ করেছেন। কিস্তির টাকা মাঠ কর্মীরা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন কিনা তা আমি জানি না। ব্যাংক আমার বিরুদ্ধে চেক জালিয়াতির একটি মামলা করেছে। আমি সেই মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছি। ৩৭ জন কৃষকের নামে মামলা হয়েছে তা আমি জানতাম না। এমনকি মামলার আগে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কৃষকদের ঋণ পরিশোধের জন্য কোনো নোটিশ দেয়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মহির মন্ডল জানান, এলাকার ৩৭ জন কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১২ জন কৃষকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার বিষয়ে কোনো কৃষক আগে জানতো না। ঋণ পরিশোধের জন্য কৃষকদের নোটিশ দেওয়া হয়নি। তদন্ত কমিটির কাছেও কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের আগে নোটিশ দিয়েছেন এমন প্রমাণ ব্যাংক দেখাতে পারেননি। এই তদন্ত আইওয়াশ ছাড়া আর কিছু নয়।

তদন্ত কমিটির প্রধান আহসানুল গণি তদন্তের বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিদের্শনা রয়েছে, গণমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে পারবো না। তাই আমি দুঃখিত।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে ঈশ্বরদী উপজেলার ভাড়ইমারী গ্রামের ৪০ জন কৃষক দলগত ঋণ হিসেবে ১৬ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে কেউ ২৫ হাজার, কেউ ৪০ হাজার টাকা করে ঋণ পান। ঋণ ও সুদের টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগে ২০২১ সালে ৩৭ জন কৃষকের নামে মামলা করে ব্যাংক। সম্প্রতি আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। গত ২৫ নভেম্বর ১২ জন কৃষককে গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে ২৭ নভেম্বর পাবনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক শামসুজ্জামান ১২ কৃষকসহ ৩৭ জনের জামিন মঞ্জুর করেন।

ইত্তেফাক/এসকে