সনেটকার হিসেবে বাংলাদেশের সাহিত্যের বিশিষ্ট, সজীব, স্বচ্ছ ও স্বতঃস্ফূর্ত অনুবাদক, তরুণ সাহিত্যপ্রেমিকের পরম আশ্রয় কল্পনালালিত ধ্বনিমাধুর্যময় ও জ্ঞানদীপ্ত ভাষার লেখক হাবীবুর রহমান (১৯২২-১৯৭৬) ছিলেন আমাদের শিশুসাহিত্য অঙ্গনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক লেখক। এমনকী তাঁকে সাতচল্লিশ-উত্তর বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম লেখক বললেও অত্যুক্তি হবে না। সামগ্রিকভাবে সুকুমার রায় ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা সুনির্মল বসু যে ধারায় বাংলাভাষার শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন হাবীবুর রহমান সেই ধারারই যোগ্যতম উত্তরসাধক। এমন একজন প্রতিভাবান লেখকের জীবন এতটা স্বল্পদৈর্ঘ্য বলে তাঁর নাম উচ্চারণের সময় দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে হবে। তা সত্ত্বেও স্বীকার করতেই হবে যে, তিনি বাংলার শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য যে সৃষ্টিচিহ্ন রেখে গেছেন তাই আমাদের মনে বিস্ময়ের সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। শিশুমনোলোভা ব্যত্যয়ী উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত ‘ল্যাজ দিয়ে যায় চেনা’ (১৯৫৯), ‘বনে বাদাড়ে’ (১৯৬৩), ‘বনমোরগের বাসা’ (১৯৭৬); গল্পের বই ‘গল্পের ফুলঝুরি’ (১৯৬৩), ‘হীরা মোতি পান্না’ (১৯৬৭), ‘মন চলে মোর তেপান্তরে’ (১৯৭৫); রূপকথার গল্পের বই ‘সাগর পাড়ের রূপকথা’ (১৯৬২), ‘বিজন বনের রাজকন্যা’ (১৯৭১); দুই খণ্ডে প্রকাশিত ছড়ার বই ‘আগডুম বাগডুম’ (১৯৬২) উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও রয়েছে তাঁর প্রকাশিত একমাত্র ছোটদের নাটকের বই ‘কালের পুতুল’ (১৯৭০)। অসাধারণ সৌন্দর্যে ভাস্বর তাঁর ছোটদের নাটক ‘আলোর ফুল’, ‘মায়া কানন’ ও ‘চিতল হরিণ’ অদ্যাবধি গ্রন্থরূপ পায়নি বলে শিশু-কিশোর পাঠকেরা বঞ্চিত হচ্ছে। ছোটদের কাছে উপস্থাপনকৃত তথ্যমূলক বই কতটা আনন্দদায়ক হওয়া সম্ভব তার নিদর্শন ‘পুতুলের মিউজিয়াম’ (১৯৬৩)। তাঁর সম্পাদিত শিশুসাহিত্যের সংকলন ‘সপ্তডিঙ্গা’ (১৯৬২) তো দীর্ঘকাল ধরে কলকাতার দেবসাহিত্য কুটীর থেকে প্রকাশিত সাহিত্য সংকলনগুলোর অভাব মোচন করেছে ও বাংলাদেশের শিশুকিশোর পাঠকদের রসনা মিটিয়েছে। শিশুসাহিত্যের সাফল্য যে লেখকের শিশুজগত্-নির্ভর কল্পনা-প্রতিভার ওপর প্রধানত নির্ভরশীল কবি হাবীবুর রহমানের রচনা পাঠে তা অনুভূত হয়। বিষয় ও আঙ্গিকের আধুনিকতায় তাঁর শিশুসাহিত্য সমৃদ্ধ। লোকায়ত জীবনের আটপৌরে ভাষা কীরকম কল্পনাললিত, ধ্বনিমাধুর্যময়, জ্ঞানদীপ্ত, কৌতুকরসে স্বাদু ও শিশুকিশোর মানসাভিমুখী হতে পারে তা অনুভব করবার জন্য বাঙালি পাঠককে হাবীবুর রহমানের শিশুসাহিত্যের কাছে বারবার ফিরে আসতে হবে।
উনিশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসের চেতনা হাবীবুর রহমানের শিশুসাহিত্যিক সত্তাকে সর্বদা উজ্জীবিত রেখেছিল বলে তিনি বিশ্বকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলেন ও ছোটদের কাছে আপন করে তুলতে চেয়েছিলেন। পশুপাখি জীবজন্তু মানুষের আশেপাশেই অবস্থান করে। তিনি অনুভব করতেন শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভবিষ্যত্ মনুষ্যত্বে উত্তরণের উপায় নিহিত থাকে। এ কারণে শিশুর প্রয়োজন জ্ঞানভারে আক্রান্ত শিক্ষা নয়, আনন্দময় শিক্ষা। শিশুসংগঠনের নেতৃত্বদানে তাঁর আত্মনিবেদনের কারণও হয়তো তাই। হাবীবুর রহমানের শিশুসাহিত্যের মূল দর্শনই ছিল আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা। হয়তো এই বিবেচনাতেই তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্য আর শিক্ষামূলক রচনার মধ্যে স্বভাবগত পার্থক্য নেই। একটা জনগোষ্ঠীর মানুষকে এগিয়ে যেতে হলে তার স্বাজাত্য বোধ থাকতে হবে। এই অনুভবও তাঁর চেতনায় গভীরভাবে ক্রিয়াশীল ছিল। বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা বোধের যে জাগরণ বাংলাদেশব্যাপী ঘটেছিল, শিশুসাহিত্যিক হাবীবুর রহমান ছিলেন তার একজন পরিশীলিত প্রতিভূ। ফলে বিশ্বজগতের নানা বর্ণালি ও বিভাকে বাঙালিত্বের চেতনায় কেমন করে জাদুর রঙে রাঙানো যায় তাও হাবীবুর রহমানের শিশুসাহিত্যের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছিল।
লেখকের ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য’ (পাঠক, ২০১৬) বই থেকে
