মেঘলা দিনে মন কেন যেন অযথাই ভারী হয়ে থাকে। রুপা সকাল থেকে এমনিতেই বিরক্ত। ছেলেপক্ষ আজ দেখতে আসার কথা। চয়ন ফুপু পুরো বাসা মাথায় তুলে রেখেছেন। উৎসবের আয়োজন পুরো বাসায়। আগেও এরকম হয়েছে। শুরুতে ছেলেপক্ষ খুব হইচই করে আগ্রহ দেখায়। রং ফরসা মেয়ে হলে যা হয় আর কী। কয়েকদিন পর থেকেই একটু একটু করে আগ্রহ কমতে থাকে। এর মাঝেই রুপার মামা মহল্লার প্রায় সবাইকে দাওয়াত দিয়ে ফেলেন—‘মা মরা মেয়ে। শুক্রবার বাদ মাগরিব ছেলেপক্ষ আসবে। ভাই আইসা একটু দোয়া কইরা যাইয়েন। আপানদেরই মেয়ে।’
মেহমানরা পুরো পরিবারসহ এসে পড়ে। কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে ছেলেপক্ষ শেষ পর্যন্ত কখনোই আসে না। সবাই খাওয়াদাওয়া হইচই করে বাসায় ফিরে যায়।
‘মা, ভুখা লাগছে।’ অর্ণব এসে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটা কারো সঙ্গে কথা বলে না। ওর কথা কেউ বুঝতেও পারে না। একমাত্র আশ্রয় ‘মা’। কালো মেঘে সন্ধ্যাটা ভারী হয়ে আসছে। ছেলেটাকে খাওয়ানো দরকার। বিরিয়ানিতে তেল বেশি হয়েছে। অর্ণবকে দেওয়া যাবে না। রুপা ভাত মাখাতে থাকে। অর্ণব চুপ করে বসে আছে সামনে।
অর্ণবের বয়স গত জুনে তিন বছর হলো। সময় কত দ্রুত যায়। অর্ণবের জন্মের সময় রুপার প্রসব ব্যথা শুরু হয় মাঝ রাতে। রুপা তখন বাসায় একা। অর্ণবের বাবা কবীর বাসায় নেই। থাকার কথাও না। সে তখন নিশ্চয়ই নেশা করে কোথায়ও বেঘোর হয়ে আছে। মেধাবী একজন মানুষ। ভালো চাকরিও ছিল। নেশার কারণে চাকরিটাও রাখতে পারল না। সেই রাতে রুপা একাই রিকশা নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। অর্ণব জন্মের সময় ফ্যাটাল ডিস্ট্রেসে ভুগেছে। মাথা ফুলে গিয়েছিল। জন্মের সময়ই ডাক্তার বলেছিলেন অর্ণবের অটিজম হওয়ার চান্স আছে।
কবীর এখন কেমন আছে? বাড্ডার দিকে নাকি বাসা নিয়েছে। বিয়ে করেনি আর। মামা বলে এখন নাকি ‘পাঠাও’ চালায়। শুকিয়ে গেছে অনেক। অর্ণব মুখে ভাত নিয়ে বসে আছে। ওকে বারবার চিবানোর কথা মনে করিয়ে দিতে হয়।
‘তুই এখনো রেডি হস নাই? পাগল পালতে গিয়ে জীবন নষ্ট করতেছস। রেডি হ। নীল শাড়ি পরবি। পিঠ খোলা ব্লাউজ আছে?’
‘ফুপু তুমি যাও। আমি রেডি হয়ে যাব সময়মতো।’
রুপার খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে। অর্ণবকে কেন যেন চয়ন ফুপু পাগল বলে। একটা অটিস্টিক বাচ্চাকে কেউ পাগল বলতে পারে এই যুগে? বাইরে কি বৃষ্টি শুরু হলো? বৃষ্টির শব্দে অর্ণবের মুখে হাসি ফোটে। অর্ণব বৃষ্টি অসম্ভব পছন্দ করে। রুপার মুখেও হাসি ফোটে। মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল ছেলেপক্ষ আসবে না।
রুপা এই ছেলের নাম শুনেই বিরক্ত হয়েছে—‘কাশেম’। পুরা নাম আবদুল কাশেম আলী। এই যুগে এ কেমন নাম। রুপার ধারণা এই ধরনের নামের মানুষজন সাধারণত সিঙাড়ার দোকানে কাজ করে। এই ছেলে নাকি শিক্ষক। মফস্সলের কলেজের গণিতের শিক্ষক। নিশ্চয়ই কথা অনেক বেশি বলে। বড় মামার ওপর রাগ হয়। ইদানীং এমন অবস্থা হয়েছে, যে কাউকে পেলেই পারলে ধরে নিয়ে আসে। বৃষ্টি আসায় সুবিধা হয়েছে। বলা যাবে ছেলেপক্ষ বৃষ্টির জন্য আসতে পারেনি।
রাত প্রায় দশটা। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বাসায় বেশ হৈহুল্লোড়। তেল বেশি হলেও বিরিয়ানি সম্ভবত মজা হয়েছে। সবাই বেশ আয়েশ করে খাচ্ছে। রুপা বারান্দায় বসা। বাসার সামনে একটা রিকশা। বৃষ্টির জন্য পরিষ্কার কিছু দেখা যাচ্ছে না। দুজন মানুষ রিকশা থেকে নেমেই রুপাদের বাসার দিকে ছোট্ট করে দৌড় দেয়। বেলের শব্দে রুপা নিজে গিয়েই দরজা খোলে। কাকভেজা হয়ে দুজন মানুষ দাঁড়ানো। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। মিষ্টির প্যাকেটও ভিজে গেছে। কম বয়স্ক ভদ্রলোকটি বোকার মতো হাসছে।
‘বাস লেট করছে। রাজবাড়ি থেকে সময় লাগে মাত্র ৩ ঘণ্টা। আজ লেগেছে ৬ ঘণ্টা। ড্রাইভারের বয়স বেশি। আমার ধারণা সে চোখেও কম দেখে। তাই জোরে চালানোর রিস্ক নেয় নাই।’
‘কাশেম তুমি কথা বেশি বলতেছো। মামণি, আজিজ সাহেবের বাসা না এটা? উনি কি আছেন?’
কোথা থেকে বড় মামা ছুটে এসেই দরজার ওপাশের বয়স্ক ভদ্রলোককে জড়িয়ে ধরেন। চাপে ভদ্রলোকের হাতের
মিষ্টির প্যাকেট ছিঁড়ে সব ভেজা চমচম দরজার সামনেই ছড়িয়ে পড়ে।
‘ভাইজান ভেতরে আসেন। ভিজে তো একদম শেষ। বাসা চিনতে কষ্ট হয়নি তো।’
‘রুপা মা একটা তোয়ালে দিবি?’
কাশেম আলীর পাঞ্জাবি থেকে কি রং উঠেছে? গলার কাছে পাঞ্জাবির লাল রং লেগে আছে। বৃষ্টির পানিতে চশমার কাচও ঘোলা হয়ে আছে। রুপার ধারণা কাশেম আলী এই চশমা পরে চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। এই মানুষ যে বেকুব টাইপের এটা নিশ্চিত। এই বেকুবকে না করে দিতে হবে। চয়ন ফুপুকে দরকার। রুপা চয়ন ফুপুকে খুঁজতে থাকে।
রাত প্রায় দুইটা। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে রাত বারোটার দিকে। ভাড়া করা মাইক্রোতে রুপা আর অর্ণব কাশেম আলীর সঙ্গে রাজবাড়ি যাচ্ছে। এক রাতে অনেক কিছু ঘটে গেল। অর্ণব নিজের ব্যাগ গুছিয়ে কাশেম আলীর সঙ্গে সামনের সিটে বসে পড়েছে। অর্ণবের কাছে পুরো ব্যাপারটা বেশ উত্তেজনার।
পেছনের সারিতে কাশেম আলীর খালুর সঙ্গে বড় মামা বসেছেন। বেশ জমিয়ে আড্ডা চলছে। ভাগ্নিকে নিজেই এগিয়ে দিতে যাচ্ছেন। রুপা মাঝের সিটে একা। রুপার গায়ে কবীরের বিয়ের শাড়ি। এই শাড়িতে কেন যেন রুপা এখনো সেই ছাত্রজীবনে দেখা কবীরের গায়ের ঘ্রাণ পায়। অনেকক্ষণ ধরেই রুপার ফোন বাজছে। অপরিচিত নম্বর। এতক্ষণ ধরতে ইচ্ছে করছিল না।
‘হ্যালো?’
‘রুপা তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। একটু বারান্দায় আসবা? একবার দেখেই চলে যাব। আর একটা কদমফুল পেয়েছিলাম। তোমাদের সিঁড়ির কাছে রেখে যাব। নিয়ে নিয়ো।’
এই কণ্ঠ রুপার খুব পরিচিত। কবীর। তুমুল গতিতে মাইক্রো ছুটে চলেছে। অর্ণবের কানে কানে কাশেম আলী কী যেন বলল। অর্ণব হেসে কুটিকুটি। ঝুম বৃষ্টিতে সামনে কিছুই দেখা যায় না ঠিকমতো। রুপা ফোন অফ করে দিয়ে বাইরে চোখ রাখে। গলার কাছে কেন যেন বাষ্পের মতো কিছু একটা আটকে আছে। বৃষ্টিতে একটু ভিজতে পারলে দারুণ হতো। কাশেম আলীকে গাড়ি থামাতে বললে কেমন হয়।
