—আমার কাছে স্বর্ণ জিনিসটির আলাদা কোনো মূল্য নেই।
—তার মানে? এই কথা কেন?
—মানে আর কিছু নয়। লোহা, তামা, কাঁসা, পিতল যেমন ধাতু, স্বর্ণও আমার কাছে তেমনই কিছু একটা।
—বুঝলাম না। হঠাত্ এমন মন্তব্যের হেতু কী? কী বলতে চাচ্ছো, একটু ঝেড়ে কাশো তো?
—দেখ, অন্যান্য ধাতুর মতো করে স্বর্ণও অলংকার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
—হ্যাঁ, হয়। তো?
—এখন সেই অলংকার বানানোর জন্য স্বর্ণ ব্যবহার না-করে যদি কেউ তামা-কাঁসা ব্যবহার করে, তাতে কী এমন ক্ষতি হবে শুনি?
—তাই বলে স্বর্ণের সঙ্গে তুমি তামা-কাঁসার তুলনা করছ?
—ইদানীং তো কাঠের, কাচের, মাটির বা শোলার অলংকারও দেখি। কই, সেগুলো দেখতে তো খারাপ লাগে না! বরং অনেক বেশি নান্দনিক ও শৈল্পিক মনে হয়।
—কেবল সৌন্দর্যের জন্যই তো স্বর্ণ দামি হয়নি। এর আলাদা একটা মূল্য অবশ্যই আছে।
—কথা হলো, স্বর্ণকেই এত দামি মনে করতে হবে কেন? তুমি হয়তো বলবে এর অপর্যাপ্ততা?
—এটা একটা পয়েন্ট। তবে...
—স্বর্ণের চেয়েও অনেক বস্তু আছে পৃথিবীতে, যা পর্যাপ্ত নেই। সেগুলোর কথা তো আলোচনায় আসে না। আমরা ভেবে শঙ্কিত হই না, পৃথিবী থেকে কী হারে কমে যাচ্ছে খাবার পানি কিংবা বিশুদ্ধ বাতাস। এগুলো তো সরাসরি জীবন ধারণের সঙ্গে জড়িত। বরং ভাবনায় থাকি—ঘরে কতখানি স্বর্ণ আছে, যা অভাবের দিনে বিক্রি করে চলবে।
—হ্যাঁ, তা তো বটেই। এটা দুর্দিনের সম্পদ বলতে পার।
—এই জন্যই স্বর্ণের দাম পড়ে গেলে ব্যথিত হই। দেখ মল্লিকা, দুষ্প্রাপ্য হলে তো এর দাম পড়ার কথা নয়, বরং দিনকে দিন বাড়ার কথা। বেড়েওছে বহুগুণ। তবে সেই বাড়ার পেছনের কারণটা কী, তা অনেকেরই অজানা।
—তো মিস্টার অনীক, তাহলে শোনান, কী তার রহস্য?
—আমরা অনেকেই জানি না, স্বর্ণ হলো সাম্রাজ্যবাদীচক্রের একটি বাতাসের তলোয়ার। এটাকে মূল্যবান হিসেবে দেখিয়ে পুরো পৃথিবীতে রাজত্ব করতে চায় তারা।
—এখানেও তোমার সেই মার্কসিজম? পারও বটে।
—মার্কসবাদ দিয়ে নয়; বরং ইতিহাস থেকে জেনেছি, প্রস্তর যুগ থেকে ধাতু ব্যবহারের যুগে প্রবেশের মধ্য দিয়ে আধুনিক সভ্যতার সূচনা ঘটে। তবে সেই সভ্যতা বিকাশে লোহা, তামা বা ব্রোঞ্জের মতো ধাতুর যে পরিমাণ অবদান আছে, স্বর্ণের তার সিকি ভাগও নেই। মূলত সামন্ত যুগে এসে রাজরাজড়ারা স্বর্ণকে মূল্যবান বস্তু হিসেবে সমাজের কাছে প্রতিষ্ঠা করে। তারা স্বর্ণের তৈরি বাহারি অলংকার পরে কিংবা রানি বা রাজকন্যাদের ঐ ধাতু দিয়ে অলংকারে মুড়িয়ে রেখে সমাজের কাছে সেটিকে একটি মিথে পরিণত করে। একটা কথা ভেবে দেখ— ‘তোমাকে রাজরানির মতো লাগছে’, ‘তুমি দেখতে ঠিক রাজকন্যার মতো’—এসব কথা সমাজে সেই আদিকাল থেকে প্রচলিত, তাই না? এখন কথা হলো, সেই ‘রাজরানি’ বা ‘রাজকন্যা’ আসলে দেখতে কেমন? এর ডেফিনেশন কী? কীসের মানদণ্ডে এই উপমা বা উপাধির প্রচলন?
—কীসের জন্য?
—আসলে ব্যক্তি রাজরানি বা রাজকন্যা সমাজে বিশেষণে পরিণত হয়ে গেছে। নইলে সব রাজরানি বা রাজকন্যাই কি দেখতে সুদর্শনা ছিল? না, তা তো নয়।
—তাহলে?
—এটা হলো সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একধরনের মিথ। কেউ কেউ প্রকৃত অর্থেই হয়তো সুন্দরী ছিলেন বটে। তা তো জেলে বা ধোপা পরিবারেও ছিল। তাই বলে কি রাজরানি বা রাজকন্যাকে ঐ জেলে বা ধোপার মেয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে কখনো? হয়নি। বরং জেলে-ধোপা গালি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
—পয়েন্ট টু বি নোটেড।
—আসলে এসব উপমান-উপমেয়র সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো জড়িত; দৈহিক সৌন্দর্য, আচারিক গুণাবলি নয়। তবে এটা ঠিক, রাজরানি বা রাজকন্যারা দেখতে যেমনই ছিল না কেন, তাদের পোশাক-পরিধান, প্রসাধন বা অলংকার ব্যবহার ছিল দর্শনীয়। এভাবেই সমাজের উঁচু মহল নির্ধারণ করে দিয়েছে কী কী জিনিস দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান হিসেবে ভাবতে হবে।
—হ্যাঁ, সে তো বুঝলাম। এর সঙ্গে স্বর্ণের সম্পর্ক কোথায়, তাই তো বুঝতে পারছি না।
—ধীরে গিন্নি ধীরে। এখানেই তো ব্যাপার। স্বর্ণকেও তারা একটি মিথে পরিণত করেছে। সেটাকে সমাজে ‘অমূল্য সম্পদ’ হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়েছে।
—তাতে ক্ষতিটা কোথায়?
—এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের। মধ্যবিত্তরা সেই স্বর্ণকে সামাজিক মর্যাদা হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর নিম্নবিত্তরা দেখে অধরা-স্বপ্ন হিসেবে।
—আবার সেই সোসালিজম, ক্যাপিটালিজম?
—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। সামন্তবাদের সময় সাধারণত রাজপরিবারের সঙ্গে সম্বন্ধ করা হতো অন্য রাজপরিবারের। এসব সম্পর্ক গড়ার সময় নিজেদের আভিজাত্যের প্রকাশ হিসেবে দেওয়া হতো সুসজ্জিত উপঢৌকন, বর্তমানে যা যৌতুক নামে পরিচিত। কে কার চেয়ে বেশি এই পণ দিতে পারে, তা নিয়ে রাজপরিবারে চলত অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সেই উপঢৌকনের বহরে স্বর্ণালংকার ছিল একটি অন্যতম বিবেচ্য বস্তু। রাজপরিবারের এই কালচার দেখে তথাকথিত ‘জাতে ওঠার লক্ষ্যে’ অনুকরণ করতে শেখে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও। এই কালচারটিই একসময় বিয়েতে মেন্ডেটরি হয়ে ওঠে।
—এটা বাঙালি কালচার।
—হ্যাঁ, সেজন্যই তো ইউরোপ বা আমেরিকায় নারী-পুরুষের মধ্যে স্বর্ণের অলংকার পরা এখন দিন দিন কমছে। তবে সেসব দেশ স্বর্ণ নিয়ে ব্যবসা করে। যদিও ধনী দেশগুলো ইদানীং আর আগের মতো স্বর্ণের মজুদ দিয়ে নয়, বরং জ্বালানি তেল দিয়ে তাদের সম্পদের পরিমাপ করছে। কারণ জ্বালানি তেলের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে সেই দেশের ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফিউচার।
—হুম। বুঝলাম।
—মাঝেমধ্যেই দেখি, নিতান্ত অযৌক্তিক কারণে দেশের স্বর্ণব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে। কথা হলো, স্বর্ণব্যবসায়ীরা তাদের দোকান বন্ধ রাখলে, তাতে আমজনতার কী এমন এসে যায়? আমার কাছে একটা স্বর্ণের দোকান কেন, পুরো স্বর্ণের মার্কেটের চেয়ে পাড়ার নাসিরের মুদির দোকানটি অনেক বেশি ইমপোর্টেন্ট। সেটি বন্ধ থাকলে বরং আমার, এমনকি তোমারও চলে না।
—এটা সেই আগরতলা আর চকির তলার তুলনা হয়ে গেল না?
—মোটেই না। স্বর্ণের দাম দশগুণ বাড়লেও আমাদের তাতে কিছুই আসে-যায় না। তবে নাসিরের দোকানের পেঁয়াজ-আলু-তেল-লবণের দাম খানিকটা বাড়লেই হিমশিম খেতে হয়। কী, হয় না?
—সে আর বলতে? যেবার পেঁয়াজের দাম রাতারাতি তিন শ টাকা কেজিতে গিয়ে ঠেকল, সেবার, কী কাণ্ডই না ঘটল পুরো দেশে।
—এই তো ধরতে পারছ। স্বর্ণের দোকান দশ বছর বন্ধ থাকলেও আমাদের তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না।
—তুমি একা অস্বীকার করলেই তো আর সেটি মূল্যহীন হয়ে যাবে না।
—দেখ, স্বর্ণের দোকান বা ব্যবসা বন্ধ থাকলে ঐ স্বর্ণব্যবসায়ী ছাড়া কি কারো কোনো প্রভাব পড়ে? পড়ে না।
—তা বুঝলাম। কিন্তু সেজুঁতির বিয়ের জন্য অন্তত কিছু তো জামানো দরকার।
—একদম নয়। এমন ফ্যামিলিতে আমি মেয়ের বিয়ে দেবই না।
—বিপ্লব করবে?
—একসময় স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ছিল। এখন নেই। একসময় তো কড়িকেও মুদ্রা হিসেবে ধরা হতো, এখন সেটি নিয়ে বাচ্চারা খেলা করে।
—বুঝলাম। তা তোমার কাছে মূল্যহীন সেই বস্তুটি আসলে কী?
—এটি একটি মূল্যবান মিথ, যার উপরের ক্রিমটি শুরু থেকেই খেয়ে যাচ্ছে ধনীরা। যত দিন পর্যন্ত এই মিথ্যা মিথটিকে টিকিয়ে রাখা যাবে, তত দিন সমাজের ঐ সুবিধাভোগী শ্রেণি আয়েশ করেই যাবে।
—বুঝেছি। এবার খেতে চল। অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাতে হবে তো। আগামীকাল তো তোমার অফিস ছুটি। দিব্যি ঘুমাবে। কিন্তু আমার এই সংসার লিমিটেড কোম্পানিতে তো আর শুক্র-শনিবার নেই।
