ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রীর জন্যও শঙ্কা

আরো তালগোল পাকাবে ব্রেক্সিট!

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৯, ২১:২৪

শিফারুল শেখ

 

এ মুহূর্তে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বটা গুরুত্বহীন একটা চাকরি! অন্তত বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে জিজ্ঞাসা করলে এমন উত্তরই হয়ত পাওয়া যাবে। এর মূলে আছে ব্রেক্সিট। গত দুই বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে বের করতে নানা চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু কোনো চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তার নিজ দলও তাকে সমর্থন দেয়নি বরং তাকে বিদায় নিতে একরকম বাধ্য করেছে। তার ব্রেক্সিট প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব তো কেউ দিতে পারেনি এখনো যা ইইউ এবং ব্রিটেনের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল। ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী যে ভালো কোনো প্রস্তাব দিতে পারবেন তা কিন্তু মনে হচ্ছে না বরং পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাওয়ারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

রক্ষণশীল পার্টির দশ জন প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন। নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে আগামী ২২ জুলাই নতুন নেতার নাম প্রকাশ করা হবে। এদের মধ্যে এগিয়ে আছেন লন্ডনের সাবেক মেয়র এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। ব্রেক্সিট রাজনীতিতে তিনি সুপরিচিত চরিত্র হিসেবে এখনো প্রাধান্য বজায় রেখেছেন। বাম ঘরানার এ রাজনীতিক বলেছিলেন, বোরকা ও নেকাব পরা নারীরা দেখতে ব্যাংক ডাকাতদের মতোই। জনসনের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্টের আবার ভুলো মন। তিনি ভুল করে চীনা কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, তার চীনা বংশোদ্ভুত স্ত্রী জাপানিজ। হাউস অব কমন্সের সাবেক নেতা আন্দ্রেয়া লিডসমন ২০১৬ সালে নেতৃত্বের লড়াইয়ে ঝরে পড়েছিলেন। সন্তানের মা হওয়ায় ব্রিটেনকে আরো বিপদের মুখে ফেলবেন বলে বলা হয়েছিল। যদিও থেরেসা মে সন্তান জন্ম দিতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। পরিবেশমন্ত্রী মাইকেল গোভ তো ইতোমধ্যেই বিতর্ক তৈরি করেছেন। তিনি কোকেন গ্রহণ করতেন বলে স্বীকার করেছেন। আর এমপি রোরি স্টুয়ার্ট তো আরো একধাপ এগিয়ে। স্বীকার করেছেন, তিনি ইরানে গিয়ে আফিম খেয়েছিলেন। এছাড়া আরো আছেন-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ, সাবেক ব্রেক্সিটমন্ত্রী ডোমিনিক রাব, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক, মার্ক হার্পার ও এস্থার ম্যাকভে।

সব প্রার্থীই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে কট্টর মনোভাব পোষণ করেন। যদিও তাদের মধ্যে বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য আছে। ব্রিটেন বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্যে আছে সেখান থেকে সহজে বের হওয়ার কোনো সমাধান কেউ এখনো দিতে পারেননি। টিভি উপস্থাপিকা থেকে রাজনীতিক হওয়া ম্যাকভে ‘হার্ড ব্রেক্সিট’কে সমর্থন করেন। তিনি ইউরোপ থেকে বের হতে চান ‘চুক্তি ছাড়া’। অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন, ‘চুক্তি ছাড়া’ ব্রেক্সিট অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। একজন সাংবাদিক তো ম্যাকভের এ কৌশলকে ‘থেলমা অ্যান্ড লুইস ব্রেক্সিট’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। রাব পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে বলেছেন যাতে কোনো আইনই ব্রিটেনকে ইইউ থেকে বের হতে বাধা না দিতে পারে। এ ধারণা অনেক রক্ষণশীলকে ক্ষুুব্ধ করেছে। তারা বলছেন, প্রয়োজনে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ায় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইইউ থেকে বের হয়ে আসার ক্ষেত্রে ব্রিটেনকে ৫০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু বরিস জনসন সেটি স্থগিত রেখেছেন আদালতের মাধ্যমে। তিনি সানডে টাইমসকে বলেছেন, এ অর্থই সমস্যা সমাধানের সুযোগ এনে দেবে। তবে ইইউ কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের পরিকল্পনা অবৈধ হবে। ভোটের সময়ই এই অঙ্গীকার করেছিল ব্রিটেন। এর ফলে ব্রিটেন খেলাপিও হয়ে যেতে পারে বলে তাদের শঙ্কা।

দশ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুজন চুক্তিহীন ব্রেক্সিটকে উড়িয়ে দিয়েছেন। স্টুয়ার্ট সফট ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছেন যেখানে কাস্টমস ইউনিয়ন থাকবে। আর স্যাম গিয়ামাহ কেবল দ্বিতীয় গণভোটের কথা বলেছেন। এই প্রস্তাবের প্রতিই ব্রিটিশদের বেশি সমর্থন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী সাধারণ জনগণের ভোটে নয়, দলের কৌশলের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেবেন। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে রক্ষণশীল দলে দুই প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে ভোট শুরু হবে। নির্বাচিত দুই প্রার্থীর নাম পরে পোস্টাল ভোটে পাঠানো হবে। ব্রিটেনে রক্ষণশীল দলের সদস্য আছে মাত্র এক লাখ ৬০ হাজার। তারাই প্রধান নেতা নির্বাচিত করবেন। আর তারা যে দলকেই সমর্থন              দেবেন সেটিই বদ্ধমূল ধারণা সবার। আর বিজয়ীর মধ্যে           একটা শঙ্কা থাকবে। সেটা হলো সম্প্রতি ইইউ পার্লামেন্টের নির্বাচনে মাত্র চারটি আসন জিতেছে তার দল। ১৫টি আসন হারিয়েছে। অথচ কয়েক মাস আগে প্রতিষ্ঠিত ইইউবিরোধী ব্রেক্সিট পার্টি ২৯ আসনে জয়ী হয়েছে। তাই পরবর্তী            প্রধানমন্ত্রী এ দলকেও অবজ্ঞা করতে পারবেন না। ফলে ব্রেক্সিট নিয়ে ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী যে তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন না সেটি বলা দুষ্কর।