শফিকুর রহমান রয়েল
সরকার পরম্পরায় প্রাপ্ত অর্থনৈতিক নাজুক অবস্থাতে দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাকিস্তানের অর্থনীতির অবস্থা এখন এতোটাই কাহিল যে, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারততো বটেই, তাদের এক সময়কার অংশ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করা বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে তারা। অথচ ১৯৭১ সালে ভারতের তুলনায় তাদের অর্থনীতি ছিল সমৃদ্ধ। বর্তমানে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের পেছনে অবস্থান করছে পাকিস্তান এবং অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে উন্নতির বিচারে বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে চাওয়ার পাশাপাশি ১৯৭১ এবং তত্পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনাসমূহকে বিভিন্ন সময়ে সামনে এনে আফসোস করছে সেদেশের বিশ্লেষকরা। পর্যাপ্ত ভূমি ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে রাখা অবদানের বিচারে করা দেশগুলোর তালিকায় কেবলই পেছনে যেতে হচ্ছে দেশটিকে। যদিও সামরিক শক্তির প্রশ্নে ভারতের মতো তাদের অবস্থানও সম্মুখসারিতে।
পাকিস্তানের অর্থনীতি কতোটা শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে, তা বোঝার জন্য কিছু প্রমাণই যথেষ্ট। গত সোমবার পাকিস্তাীি রুপী আগের দিনের তুলনায় মুক্তবাজারে মান হারিয়ে বসে ০.৭০ শতাংশ। ঐদিন আন্তঃব্যাংক ও কার্ব মার্কেটের ব্যবধান ২.৩১ বাড়িয়ে দিয়ে মুক্তবাজারে প্রতি ডলার কিনতে গুণতে হচ্ছিল ১৪৩.৭০ রুপি। মুদ্রা বাজারের এই অস্বাভাবিক আচরণের কারণটা জানলে একটু অবাক না হয়ে উপায় নেই। ডলারের অপ্রতুল সরবরাহতো আছেই, তার ওপর দুরাবস্থা কাটিয়ে উঠতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছ থেকে তিন বছরের জন্য ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার গ্রহণের চুক্তির বিষয় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার খবরটা ছড়িতে যাওয়ারই পরিণতি এটি; কারণ আশঙ্কা করা হচ্ছে এর ফলশ্রুতিতে বিনিময়হার ব্যবস্থায় পরিবর্তন অনিবার্য। বাজারে অংশগ্রহণকারীরা ভাবছেন, বেইলআউট প্যাকেজের কারণে পাকিস্তানে যদি স্বাধীনভাবে চলা মুদ্রা বিনিময়হারের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয় তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রুপিকে রক্ষায় মুদ্রা বাজারে তাদের হস্তক্ষেপ সীমিত কিংবা একেবারেই বন্ধ করে দিতে পারে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে ডলারের এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ হার ১৪৩.৭০, এ খবরটা জানানো হয় এক্সচেঞ্জ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অফ পাকিস্তানের (ইসিএপি) তরফ থেকে। অথচ ওইদিনই করাচির বিভিন্ন অংশে ১৪৪ থেকে ১৪৪.৫০ রুপিতে ডলার কিনতে হচ্ছিল। ইসিএপির জেনারেল সেক্রেটারি জাফর পারাচা জানান, বিনিয়োগকারী এবং সাধারণ লোকজনের ডলারের বর্ধিত চাহিদার জন্যেই ওপেন মার্কেটে রুপি কেবলই তার মান হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো যোগ করেন, মুক্ত বাজার ডলারের ঘাটতি দেখেছে। বাজারটি এখন পর্যন্ত চাহিদা চালিত ধরনে রয়েছে। আইএমএফ ও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বেইলআউট চুক্তিতে পৌঁছার কারণে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশা করছে বাজারভিত্তিক বিনিময়হার বাস্তবায়নসহ অগ্রাধিকারভিত্তিতে কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করবে। ইসিএপির সভাপতি মালিক বোস্তানের তথ্যানুযায়ী, গত ১২ এপ্রিল ডলারের বিপরীতে দিন শেষ হয় ১৪৩.৫০ এ। সকালে কিছুটা আতঙ্ক কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত বাজার কিছু স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখাতে শুরু করে। খোলা বাজারের বিষয়ে সন্দেহ বা অবিশ্বাসের বিষয়ে মুদ্রা বিনিময়ের কোম্পানিগুলো স্টেইট ব্যাংক অফ পাকিস্তানের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখছে। বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, আইএমএফ এবং পাকিস্তানি সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রধান আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল এই মুদ্রার বিনিময়হার প্রণালী আর এতে সরকারকে নমনীয়ই মনে হচ্ছে।
আইএমএফ-এর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকেও বোঝা গেছে যে, তারা বিনিময়হার ব্যবস্থার বিষয়ে শর্তারোপ করবে। কারণ, তারা মনে করে রুপি অতিমূল্যায়িত হচ্ছে। এমন হলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এক ডলারের বিপরীতে রুপির মান দাঁড়াতে পারে ১৬০ থেকে ১৬৫। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বিনিময় হার ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলে রুপি পড়বে প্রচণ্ড চাপের মুখে। যে কারণে স্টক মার্কেটের কাছ থেকে স্বল্পমেয়াদি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া গ্রহণ করা লাগতে পারে। স্টেইট ব্যাংক মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারে মুদ্রাস্ফীতির উপর। ফলে আর্থিক স্থিতিশীলতাকে সুরক্ষিত রাখা শুরু হবে সামঞ্জস্যহীনভাবে প্রভাবান্বিত হতে পারে দরিদ্ররা।
আইএমএফের কর্তাব্যক্তিরা অনুমোদন দিলেই এখন বেইলআউট প্যাকেজ গ্রহণ করছে। পাকিস্তানের তরফ থেকে এ কথা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইএমএফ-এর কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের ব্যাপারে এর আগে ইমরান খান আপত্তি তুললেও শেষ পর্যন্ত আর ঐ অবস্থানে থাকতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যই সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট হবে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে ঠিকই; কিন্তু সেই সাহায্য যথেষ্ট নয়। প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের অধীনে চীন এরই মধ্যে পাকিস্তানে বেল্ট ও রাস্তা উন্নয়নের জন্য অনেক বিনিয়োগ করে ফেলেছে। হয়তো নতুন করে আবার বিনিয়োগ করবে অনেক ভেবেচিন্তে। সেইদিনের অপেক্ষায় থেকে আইএমএফ-এর প্রস্তাবিত সুযোগ গ্রহণ না করলে পরবর্তীতে হয়তো আরো বেকায়দায় পড়তে হতে পারে। এ দিকটিই হয়তো বিবেচনা করেছেন এবার ইমরান খান।
দৈবিক কোনো কিছু না ঘটলে আইএমএফ-এর কাছ থেকে পাকিস্তানের ঋণ গ্রহণ করাটা এখন নিশ্চিত। এটি হবে গত ত্রিশ বছরের মধ্যে আইএমএফ-এর কাছ থেকে পাকিস্তানের ত্রয়োদশতম বেইলআউট প্যাকেজ। এর আগেরবার প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ এই বৈশ্বিক আর্থিক সংগঠনের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করেই অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা অবশ্য আগের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। অর্থনীতি প্রায় স্থবির। প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করার পাশাপাশি অর্থনীতির বৃহত্ আনুষ্ঠানিকতা, মানবপুঁজির পেছনে যত্সামান্য ব্যয় অধিকন্তু দারিদ্র্যকে সামাল দিতে হবে।
—দ্য ডন অনুসরণে
