তেল ট্যাংকারে হামলা

এক অশনি সংকেত!

আপডেট : ১৬ জুন ২০১৯, ২১:২৮

তালেব রানা

 

আবারো বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। হরমুজ প্রণালীর কাছে ওমান উপসাগরে এক মাসের ব্যবধানে ছয়টি তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনা নতুন এই উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় ইরানকে দায়ী করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বিষয়টি তারা হালকাভাবে নিচ্ছেন না। আর ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব দ্রুত কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে। ইরান এসব অভিযোগ অস্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিতে  বিশ্বে তাদের মিত্রদেরকে পক্ষে আনার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের ট্যাংকারে এ ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের এক অশনিসংকেত হতে পারে। 

পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমাদের সঙ্গে ইরানের টানাপোড়েনের অবসান হয় ২০১৫ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে। ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন এবং জার্মানি। চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে সম্মত হয়। বদলে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমারা। কিন্তু গত বছর ওই চুক্তি থেকে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। একইসঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কোনো দেশ যাতে ইরান থেকে তেল কিনতে না পারে, সেজন্যেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি আবারো শুরুর হুমকি দিয়েছে। একইসঙ্গে বলেছে, ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে তারা। ইরানের এ ধরনের পদক্ষেপ ঠেকাতে এবং হরমুজ প্রণালীকে উন্মুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র সব ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। ইতোমধ্যে তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত সেনা মোতয়েনের পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বোমারু বিমান মোতায়েন করেছে।

এই হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় তেল রপ্তানি হয় হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে। এই রুট দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যায় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্যান্য জায়গায়। হরমুজ প্রণালীর একদিকে আছে আরব দেশগুলো। এসব দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো রয়েছে। হরমুজ প্রণালীর অন্যপাশে রয়েছে ইরান। হরমুজের সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অংশ সেখানে ইরান এবং ওমানের দূরত্ব মাত্র ২১ মাইল। এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের জন্য দুটো লেন রয়েছে এবং প্রতিটি লেন দুই মাইল প্রশস্ত। হরমুজ প্রণালী সংকীর্ণ হতে পারে কিন্তু তেল বহনের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাহাজ চলাচলের জন্য এটি যথেষ্ট গভীর এবং চওড়া। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন এক কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়।

হরমুজ প্রণালী হচ্ছে ইরানের জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইরানের অর্থনীতির জন্য এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের মোট রপ্তানি আয়ের দুই-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি তেল রপ্তানির মাধ্যমে। ২০১৭ সালে ইরান ৬৬০০ কোটি ডলারের তেল রপ্তানি করেছে। ইরান বলছে, তাদের তেল রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধা দিলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কোনো তেল রপ্তানি করা যাবে না।

১৯৮০’র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ইরাক এবং ইরান পরস্পরের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে চেয়েছিল। তখন জ্বালানি তেল বহনকারী ২৪০টি তেলের ট্যাংকার আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৫৫টি ডুবে গিয়েছিল। ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় তাহলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। গত বৃহস্পতিবার ট্যাংকারে হামলার পর জ্বালানি তেলের দাম ৪ শতাংশ বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালীকে উন্মুক্ত রাখতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবও ট্যাংকারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকট সম্ভাব্য সামরিক যুদ্ধের আতঙ্ক তৈরি করেছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, নতুন করে তেল ট্যাংকারে হামলা সামরিক উত্তেজনা বাড়াবে। ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে কূটনৈতিক তত্পরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ইরানকে ট্যাংকারে হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছে।

ট্রাম্প সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে তাত্পর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এই সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্র যেমন সৌদি আরব ও ইসরাইলের আরো ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েছে, তেমনি ইরানের বিরুদ্ধে চরমতম বৈরী অবস্থান গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে উস্কানি দিয়ে আসছে। এ কারণে বিশ্ব কূটনীতির পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, মার্কিন প্রশাসনের নীতিতে এই বিশাল পরিবর্তন এবং ইরানের অনমনীয় মনোভাব শেষ পর্যন্ত বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।