তারিক হাসান
জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা। রোগের নাম পরিকাঠামোর অভাব। আর সেই কারণে রোগীদের অসন্তোষ আর আক্রোশ তৈরি হওয়া। সেই রোগে আক্রান্ত হয়েই গত এক সপ্তাহ যাবত্ অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ এবং পরবর্তীতে ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে। প্রতিকার চেয়ে ভারতজুড়ে ডাকা হয়েছে হরতাল।
গত সোমবার কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে এক রোগীর চিকিত্সায় গাফিলতির অভিযোগে ঘটনার সূত্রপাত। তা রূপ নেয় জুনিয়র ডাক্তারদের হয়রানিতে। পরিবহ মুখার্জি নামে এক জুনিয়র ডাক্তার গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এর প্রতিবাদে জুনিয়র ডাক্তাররা নিরাপত্তা এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে শুরু করেন কর্মবিরতি। পরের দিন পশ্চিমবঙ্গের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল এই কর্মবিরতিতে যোগ দেয়। গত বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশাসহ আরো কয়েকটি রাজ্যে একই ইস্যুতে শুরু হয় আন্দোলন। ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সহমর্মিতা জ্ঞাপন করে ভারতজুড়ে হরতালের ডাক দেয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কেন ভারতজুড়ে চিকিত্সকদের হরতাল? সমস্যার বীজ লুকিয়ে রয়েছে গভীরে। এতদিন যা স্ফুলিঙ্গ আকারে ছিল, কলকাতার এই ঘটনা তাতে ঘৃতাহুতি দিয়েছে।
২০০৮ সালে ওড়িশায় চিকিত্সকরা হরতালের হুমকি দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গুজরাটেই জুনিয়র ডাক্তাররা হরতাল করেছিলেন। নরেন্দ্র মোদিই তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। এসমা (এসেন্সিয়াল সার্ভিস মেন্টেনেন্স অ্যাক্ট) জারি করে জুনিয়র ডাক্তারদের সেই হরতাল ভাঙার পাশাপাশি ১৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে দিল্লিতে ডাক্তাররা নিরাপত্তাসহ আরো কিছু দাবিতে হরতাল করেছিলেন। ২০১৬ সালে দিল্লিতেই নার্সরা হরতাল করেন। ২০১৭ সালে বিজেপি পরিচালিত রাজস্থানে প্রতিবাদ হিসেবে একদিনে এক সঙ্গে ছুটি নিয়েছিলেন চিকিত্সকরা। তাঁদের বিরুদ্ধেও এসমা জারি হয়েছিল। ২০১৮ সালে জম্মু-কাশ্মীরেও ডাক্তাররা হরতালের ডাক দিয়েছিলেন।
কেন বারবার হরতাল? চিকিত্সকরা বলছেন— নিরাপত্তার অভাব তো আছেই। রয়েছে অতিরিক্ত কাজের চাপ। ভারতের সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারপিছু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। তার ওপর বেশির ভাগ দায়িত্বই নিতে হয় জুনিয়র ডাক্তারদের। স্বাভাবিকভাবেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সময়মতো রোগীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে ওঠে না। ফলে রোগীর মৃত্যু হলেই আত্মীয়রা মনে করছেন এই জুনিয়র ডাক্তারদের কারণেই এই মৃত্যু। তাদেরকেই হাতের কাছে পাওয়া যায়। ফলে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। একই অবস্থা নার্সদের ক্ষেত্রেও। ভারতের চিকিত্সকদের সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিত্সককে দিনে গড়ে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ঘণ্টা চারেক সময়ে আউটডোরে রোগী দেখতে হয় গড়ে তিন শতাধিক। এই বিরাট সংখ্যক রোগীর ওজন আর ব্লাড প্রেসার মাপাই বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। তার পর চিকিত্সা। ফলে জরুরি বিভাগে মরণাপন্ন রোগী এলে অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। পশ্চিমবঙ্গেও সেটাই ঘটছে। পশ্চিমবঙ্গের ঘটনায় অন্য রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের মতো কড়া হননি মমতা ব্যানার্জি। জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতি নরম মনোভাব নিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গেও চিকিত্সা পরিষেবার রোগ সেই একই। মমতা কী পারবেন এই রোগ সারাতে? নাকি সাময়িক সমাধান হলেও রোগের শিকড় যাবে আরো গভীরে?
