সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি যে কোনো বিচারেই উল্লেখের দাবি রাখে। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টিকে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিল তারাও এখন অকুণ্ঠচিত্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের রেটিং এর ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে প্রাথমিকভাবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ কার্যকর উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করে চলেছে তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এমন অর্জন অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির পক্ষেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করছি বাংলাদেশ সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন বিষয়ে যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করে তার সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের পরিসংখ্যানের কোনো মিল থাকে না। চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে তা নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রান্ত হয়ে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। তাহলে আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২ শতাংশ কেন নির্ধারণ করা হলো? সাধারণত কোনো দুর্বিপাক না ঘটলে আগের বছরের অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছর লক্ষ্যমাত্রা আরো বেশি করে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে কমিয়ে দেখানো হয়েছে। এটা বিস্ময়কর নয় কি?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে এক ধরনের মতান্তর লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেন উন্নয়ন সহযোগীদের পরিসংখ্যান তার চেয়ে অন্তত ১ শতাংশ কম থাকে। যেমন:সরকার বলছেন, চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগীরা বলছেন, প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীরা স্ব-স্ব অবস্থানে অনড় থাকেন। ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রকৃত হার কত অর্জিত হচ্ছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষ এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যে থাকছে। একই অর্থনৈতিক সূচকের অর্জন তো দুই রকম হতে পারে না। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে সরকার যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করছেন হয়তো তা অতিরঞ্জিত অথবা উন্নয়ন সহযোগীরা যে পরিসংখ্যান আমাদের কাছে তুলে ধরছেন তা ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। সেক্ষেত্রে দুপক্ষ একই টেবিলে বসে বিষয়টি সমাধান করা যেতে পারে। দুপক্ষের পরিসংখ্যান ভুল বা সঠিক হতে পারে না। নিশ্চয়ই একপক্ষ ভুল করছেন। তাহলে সঠিক পরিসংখ্যান খুঁজে বের করতে অসুবিধা কোথায়? যত নির্মমই হোক না কেন আমাদের সঠিক পরিসংখ্যান দিতে হবে এবং এক্ষেত্রে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান দিয়ে কখনোই টেকসই উন্নয়ন আশা করা যায় না। যেমন- ভঙ্গুর ভিতের উপর কোনো বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাই পরিসংখ্যানগত বিভ্রান্তি দূরীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমাত্রায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু উচ্চহারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনই একমাত্র কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হতে পারে না। প্রবৃদ্ধি কিভাবে অর্জিত হচ্ছে, কোথা থেকে আসছে এগুলো বিবেচনার দাবি রাখে। একই সঙ্গে অর্জিত প্রবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের কল্যাণে কতটা ভূমিকা রাখছে এসব মৌলিক বিষয়ও বিবেচনায় রাখতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের সবচেয়ে বড় বা গ্রহণযোগ্য পন্থা। কিন্তু সেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি অনৈতিকভাবে উপার্জিত সম্পদের মাধ্যমে হয় তাহলে সেটা যে কোনো বিচারেই পরিত্যাজ্য। টেকসই উন্নয়নের জন্য উত্পাদনশীল খাত থেকে প্রবৃদ্ধি অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। একজন ছিনতাইকারী মানুষের সম্পদ লুটে নিয়ে তার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ করে। অবৈধ বা অন্যায়ভাবে উপার্জিত এই সম্পদ মানি লন্ডারিং বা অন্য কোনোভাবে রূপান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু এভাবে উপার্জিত অর্থ কি আমাদের কাম্য হতে পারে? অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আসতে হবে উত্পাদনশীল খাত থেকে। উত্পাদনশীল খাত থেকে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলে টেকসই উন্নয়ন এবং মানব কল্যাণে সহায়ক হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমরা বিদেশ থেকে চামড়ার জুতা আমদানি করে তা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে রাতারাতি বিপুল পরিমাণ অর্থ-বিত্ত অর্জন করতে পারি। এটা আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নিশ্চিতভাবেই অবদান রাখবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কিছু মানুষের হাতে অর্থ এলেও তা দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি স্থানীয়ভাবে জুতার কারখানা স্থাপন করে উত্পাদিত জুতা বাজারজাত করতে পারি তাহলে অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবো। কর্মসংস্থানবিহীন জিডিপি প্রবৃদ্ধি একটি দেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বিপদ ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে উচ্চ প্রবৃৃদ্ধি অর্জন করছে তা অনেকটাই কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধির মতোই। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যদি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হয় তাহলে অর্জিত সম্পদ সামান্য কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জিভূত হতে পারে। এই অবস্থায় সামাজিক এবং সম্পদ বৈষম্য তীব্রতর হতে পারে। আমরা কি নিশ্চিত করে বলতে পারবো, অর্জিত প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে? দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই এগোনোর সুফল ভোগ করছে সামান্য কিছু ভাগ্যবান মানুষ। দেশে বর্তমানে ৪ কোটি ৮২ লাখ মানুষ বেকার। প্রতিবছর ১৪ লাখ মানুষ শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ১৩ লাখ মানুষের। বেকারত্বের কারণে অসমতা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। গিনি কোয়েফিসিয়েন্ট এর সূচক অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে আয় বৈষম্য সূচক ছিল শূন্য দশমিক ৪৮। এটা ভয়াবহ অবস্থার ইঙ্গিতবাহী। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়া কোনোভাবেই দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব নয়। কৃষি বা অন্য কোনো খাতের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন শিল্পায়নের উপর বিশেষ জোর দেয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা হচ্ছে দেশের শিল্প সেক্টরের অবস্থা তেমন একটা ভালো নয়। ২০১২ সালে দেশে বড় ধরনের শিল্প-কারখানার সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৬৩৯টি। ২০১৯ সালে তা ৩ হাজার ৩১টিতে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে। একই সময়ে মাঝারি শিল্প-কারখানার সংখ্যা ৬ হাজার ১০৩টি থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৪টিতে।
বর্তমান সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে উন্নয়নের সুফল কিভাবে জনগণের জন্য নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু এই প্রচেষ্টাই শেষ নয়। আমাদের আরো দ্রুতগতিতে কাজ করতে হবে।
n লেখক:সাবেক জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা
