ড. এজাজ মামুন
সম্প্রতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে। এ যাবত্কালের সবচে বড় বাজেট এটি। গত বছরের চাইতে ১৮ শতাংশ বড়। গত বছরের থেকে প্রায় ৭.৮ শতাংশ বাড়িয়ে এবার কৃষি খাতে মোট ২৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে এই বাজেটে। যা চলতি অর্থবছরের জন্য ২৬ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা প্রস্তাবিত ছিল (সংশোধিত বাজেট তা কমে হয়েছে ২৫ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা)। প্রাথমিকভাবে গত বছরের কৃষি বাজেটের সঙ্গে এ বছরের বাজেটের অনেকাংশে মিল থাকলেও এবারের বাজেটে বেশকিছু ইনোভেটিভ বিষয়ের সংযোজন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বেশকিছু বিষয় এ বাজেটে তুলে আনা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে কাজে লাগানো, উদ্যোক্তা তৈরি, শহরের সুবিধা গ্রামে,
দারিদ্র্য বৈষম্য নিরসন প্রভৃতি সার্বিকভাবে দেশের গ্রামীণ তথা কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। স্বাভাবিক বিনিয়োগের অতিরিক্ত হিসেবে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা, কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যুত্ চালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুত্ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান অব্যাহত রাখা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফসলহানির ক্ষতি থেকে কৃষকদের রক্ষার্থে শস্য বীমা একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করার পরিকল্পনা এবারের কৃষি বাজেটের অন্যতম আলোচনার বিষয় বলে অনেকে মনে করেন।
কৃষি পণ্যের আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। আর এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনেকগুলো অনুষঙ্গ। আমরা রপ্তানি করতে চাইলেই যে তা করা যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের প্রবেশ করতে হলে কৃষিপণ্যের মান যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনিভাবে জৈব নিরাপত্তাও করতে হবে নিশ্চিত।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য আমাদের ট্রেড ডিপ্লোমেসিকেও বহুমুখী ও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। খাদ্য হিসেবে ব্যবহার্য কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রক্রিয়া অন্য যে-কোনো পণ্যের চাইতে একটু ভিন্নতর। খাদ্য হিসেবে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ফসল ফলানো থেকে ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি টেকনোক্র্যাটদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। যদি আমরা কৃষিপণ্য রপ্তানিকে ফলপ্রসূ করতে চাই আর কৃষকের ভাগ্যোন্নয়ন করতে চাই, শুধুমাত্র নগদ প্রণোদনা নয়, উত্পাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছানো ও ভ্যালু চেইনের উন্নয়নের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া, এর অবকাঠামো তৈরির জন্য সঠিক বাজেট ও কর্মপ্রন্থার প্রয়োজন রয়েছে। আমাদের কৃষকরা তাঁদের উত্পাদিত ফসল সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারেন না। আর এটাই তাঁদের উত্পাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য না পাবার অন্যতম কারণ। প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণাগার না থাকার কারণেই কৃষকরা বাধ্য হয়েই মৌসুমে তাঁদের ফসল স্বল্পমূল্যে তুলে দেন ভোক্তা কিংবা তৃতীয় পক্ষের হাতে। এর থেকে কৃষকের বেদনার আর কিছু নেই। সরকার ২০১৯-২০ বছরের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে এই অতিজরুরি বিষয়টি সংযোজন করলে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
উত্পাদন খরচ কমানোর জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতিতে সরকার ভর্তুকি দেওয়ার ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উত্সাহিত করার বাজেট প্রস্তাবনা করেছেন। এটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য বিষয়গুলোকেও সরকার বিবেচনায় আনবেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মধ্যস্বত্বভোগী দালালদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কৃষকের কাছ থেকেই ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয় করা, সরকারি উদ্যোগেই এই ধান সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার জন্যে অনেকেই সরকারের শতভাগ পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করেছে, আর এ জন্য কৃষি বাজেটকে সেভাবে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে। সরকারের ক্রয়কৃত ধান আংশিক সরকারি ব্যবস্থাপনায় রপ্তানি আর, আংশিক চাল বানিয়ে ন্যায্যমূল্যে বাজারজাত করার পরামর্শ দিয়েছেন অনেক অভিজ্ঞ কৃষি বিশেষজ্ঞ। অনেকেই প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ধান সংরক্ষণগার বা সাইলো গড়ে তোলার আবশ্যকতার কথা বলেছেন, যেখানে কৃষক প্রয়োজন মতো ধান মজুত করতে পারবেন আর মজুতকৃত ধানের একটি অংশের ন্যায্যমূল্যের সমপরিমাণ অর্থ যে-কোনো তফসিলি ব্যাংক থেকে লোন হিসেবে নিতে পারবেন। এতে ব্যাংক যেমন লাভবান হবে তেমনি কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং মূল্য নিশ্চিত করা সহজ হবে। সঙ্গে সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থেকে রেহাই পাবেন কৃষক। এই অবকাঠামো তৈরিতে বাজেট বরাদ্দেরও প্রয়োজন রয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত রয়েছে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬২ শতাংশ। বিগত একযুগে কৃষিখাতে গড়ে চার শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তাই আমাদের আশাবাদ সরকার আরো গ্রহণযোগ্য বাজেট ও এটাকে ফলপ্রসূ করার জন্য সবরকম ব্যবস্থা নেবেন।
n লেখক :কৃষি বিজ্ঞানী
