শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়তি কেন?

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩:২৭

বাংলাদেশে এখন আমনের ভরা মৌসুম। হয়েছে বাম্পার ফলন। তারপরও চালের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই, বরং বাড়ছে। এর কারণ কী? এই প্রশ্ন কৃষি মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির। তারা এর কারণ অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে।

প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, চাল ব্যবসা বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপের হাতে চলে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তারা বাজারে নতুন চাল আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে কিনে নিয়ে মজুত করে। পরে তারা এই চাল প্যাকেটজাত করে বাজারে ছাড়ে। তারা প্লাস্টিকের সুদৃশ্য বস্তায় ৫০ কেজি ছাড়াও বিভিন্ন আকারের প্যাকেটে বাজারজাত করে। এই ‘ভিআইপি চালের' দাম অনেক বেশি। আর তার প্রভাবে সাধারণভাবে সব চালের দাম বাড়তি হচ্ছে। তাদের প্রভাবে চটের বস্তার চাল বাজার থেকে দিন দিন উধাও হয়ে যাচ্ছে।

তবে এটাই একমাত্র কারণ নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং গমের ব্যবহার কমে চালের চাহিদা বাড়ার কারণেও চালের দাম বাড়ছে বা কমছে না। এরসঙ্গে মজুত প্রবণতাও কাজ করছে। প্রভাব ফেলছে সরকারের ধান সংগ্রহে।

ছবি: ডয়চে ভেলে

সাধারণ মিলে ভাঙানো মিনিকেট চালের ৫০ কেজির বস্তার দাম তিন হাজার ৪০০ টাকা হলেও কর্পোরেট কোম্পানির একই পরিমাণ ‘ভিআইপি’ চালের দাম তিন হাজার ৭০০ টাকা। বাজারে দামের এই পার্থক্য পুরো চালের বাজারকে অস্থির করে তোলে। আর এখন কর্পোরেটরাই চালের বাজারের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে। তার সংঘবদ্ধ। অন্য যে শত শত মাঝারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছেন তারা  চালের বাজারে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। তাই কর্পোরেটরাই এখন চালের দাম ঠিক করে দিচ্ছে।

কারা চাল ব্যবসায়

ব্যবসায়ীরা জানান, চাল ব্যবসায় এখন বাজারে যেসব কর্পোরেট গ্রুপের প্রভাব তাদের মধ্যে আছে সিটি গ্রুপ (তীর), মেঘনা গ্রুপ (ফ্রেশ), এসিআই, প্রাণ গ্রুপ, বাংলাদেশ এডিবল অয়েল কোম্পানি, আকিজ গ্রুপ, বসুন্ধারা গ্রুপসহ আরও কয়েকটি  শিল্প গ্রুপ। এছাড়া সাগর স্পেশাল, আড়ং ন্যাচারাল, মোজাম্মেল স্পেশাল রাইস, সেনা রাইস, ফরচুন রাইস, চাষি ও অ্যারোমেটিক রাইসসহ আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের প্যাকেটজাত চাল বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর ৫০ কেজির মিনিকেট চালের দাম ৩ হাজার ৭০০ টাকা হলে এক কেজির দাম পড়ে ৭৪-৭৫ টাকা।

আর এই কারণে চালের বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। যে চাল প্যাকেটজাত করে ৭৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, সেই চালই খোলা ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য চালের ক্ষেত্রেও দামের এই পার্থক্য রয়েছে। আর টিসিবির হিসাব বলছে গত এক মাসের ব্যবধানে সব ধরনের চাল কেজিতে দুই থেকে থেকে পাঁচ টাকা বেড়েছে।

আমনের বাম্পার ফলন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি আমন মৌসুমে সারা দেশে ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আবাদ হয়েছিল ৫৯.৫৪ হেক্টর জমিতে। এবার আমন ধানের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক কোটি ৬৩ লাখ মেট্রিক টন। আর হেক্টরপ্রতি উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৩. ৫৬ মেট্রিক টন।

ছবি: ডয়চে ভেলে

এখন পর্যন্ত সারাদেশে আমন ধান কাটা হয়েছে ৫০ শতাংশ। আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। হেক্টরপ্রতি ৩.৫৬ মেট্রিক টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণে ধান কাটা হয়েছে, তাতে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ৩.৬ থেকে প্রায় ৪ মেট্রিক টন। এবার কৃষকও আমনের ভালো দাম পাচ্ছেন। ধানের মান অনুযায়ী এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে এখন আমন ধান বিক্রি হচ্ছে। এতে কৃষকের যে খরচ হয়েছে তার চেয়ে বেশি পাচ্ছেন তারা।

চালের দাম বেশি কেন?

কুষ্টিয়ার খাজা নগরের চালকল মালিক জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘আমরা তো এখন কোনঠাসা হয়ে পড়ছি। বড় বড় শিল্প গ্রুপ এখন চাল ব্যবসায় ঢুকেছে। তারা চালের বাজার খালি করে দিচ্ছে। নতুন চাল উঠলেই তারা তা কিনে নিয়ে প্লাস্টিকের সুদৃশ্য বস্তা এবং প্যাকেটজাত করে বেশি দামে বিক্রি করে। ৬০ টাকা কেজির চাল তারা ৭৫-৭৬ টাকায় বিক্রি করে। আগে তারা সরু, পোলাও ও সুগন্ধি চাল এভাবে বিক্রি করত। এখন তারা প্রায় সব ধরনের চালই বিক্রি করছে। এর প্রভাব বাজারেও পড়ছে।’

তবে এবার ধানের দামও বেশি। এবার প্রতিমন ধান ২৫০-৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তার প্রভাবও আছে। তবে শিল্প গ্রুপগুলোর কারণে আরও বেশি বলে জানান তিনি। বলছেন, ‘আমরা তো পারিনা, তারা বিএসটিআই থেকে প্লাস্টিকের বস্তা, প্যাকেটের অনুমোদন নেয়, নামের অনুমোদন নেয়। আর আমরা প্লাস্টিকের বস্তায় ভরলে আমাদের জরিমানা করা হয়। এখানে চালের দাম নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকি চলছে। মোট চাল ব্যবসায়ীর শতকরা পাঁচ ভাগ তারা। কিন্তু বাজারের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশ অব বাংলাদেশের(ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, ‘এখন ভরা মৌসুমে চালের দাম সবচেয়ে কম থাকার কথা। কিন্তু কর্পোরেট সিন্ডিকেটের কারণে তা হচ্ছে না। তারা এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাই দাম ঠিক করে দিচ্ছে। তারা একবার যে দাম ঠিক করে দেয় তার থেকে আর কমায় না।’

তিনি বলেন, ‘এখন ৫০ কেজি থেকে শুরু করে ২৫,১০, ৫ এমনকি দুই কেজির সুদৃশ্য প্যাকেটে চাল পাওয়া যায়। এই চালের দাম কমপক্ষে শতকরা ১০- ১৫ টাকা বেশি। তাদের প্রভাবে বাজার থেকে খোলা চটের বস্তার চাল উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে বাজার তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এর ফল হচ্ছে  প্রচলিত  চটের বস্তার চালের দামও বেড়ে যাচ্ছে। এই কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা চাল মজুত করে রাখে। ভরা মৌসুম চিন্তা করেনা। তারা সারা বছরের ব্যবসার পলিসি ঠিক করে চালের দাম নির্ধারণ করে দেয়, ফলে মৌসুমেও চালের দাম কমে না। আমরা চালের দাম ঠিক করে দেওয়ার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছি, কিন্তু কাজ হয়নি।’

ছবি: ইত্তেফাক

এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে একটি কর্পোরেট গ্রুপের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে চাল বাজারজাত করি। আমাদের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা তৈরি হয়েছে। আমরা ভালো প্যাকেটে চালের গুণগত মান বাজায় রেখে প্যাকেটজাত করে ক্রেতাদের দিই। তারাও কেনেন। আমরা ভ্যালু অ্যাড করি। তাই দামও একটু বেশি। যারা কম দামে কিনতে চান তারা খোলা চাল কিনতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘এটা আসলে মার্কেটিং পলিসি। আমাদের মার্কেটিং পলিসি অনুযায়ী আমরা বাজারজাত করি। তবে আমাদের বিরুদ্ধে মজুতের অভিযোগ ঠিক না।’

আরও কারণ

সেন্টার পর পলিসি ডায়ালগের(সিপিডি) গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে একটু উচ্চ মানের চাল বাজারজাত করছে প্যাকেট করে। তার একটি প্রভাব থাকতে পারে চালের দাম না কমায়। তবে আমি মনে করি এবার কৃষি উপকরণ, সারের দাম বেশি। কৃষি শ্রমিকের মজুরিও বেশি, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে ধানের। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের আমদানি কমে যাওয়া। ফলে বাংলাদেশের মানুষের চালের চাহিদা বেড়েছে। সরকার পরিস্থিতির কারণে বেশি ধান সংগ্রহ করে একটি মজুত গড়ে তুলছে। এইসব কারণে চালের চাহিদা বেড়েছে। তাই ভরা মৌসুমেও দাম কমছেনা।’

তিনি বলছেন,‘মিল মালিকদের মধ্যেও মজুত প্রবণতা বেড়েছে। কারণ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা মনে করছেন সামনে আরও বেশি দাম পাওয়া যাবে। তাই অতিরিক্ত মুনাফার আশায় তারা মজুত করছেন।’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/এএএম