কাপাসিয়ায় দুই পোল্ট্রির বর্জ্যে পরিবেশ ও ফসলের ক্ষতি

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:১১

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নের কপালেশ্বর গ্রামে প্রোটিন হাউজ ও টোক ইউনিয়নের কেন্দুয়াব গ্রামে ডায়মন্ড নামে দুটি  পোল্ট্রি খামারের সৃষ্ট বর্জ্য ও নিষ্কাশিত দূষিত পানিতে বিনষ্ট হচ্ছে এলাকার খাল-বিল, নদী-নালার পানি, মাছ ও কৃষি জমি। উত্কট দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্কুল কলেজ মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীসহ এলাকাবাসী। মুরগির বর্জ্য ও বিষাক্ত পানির দ্বারা আশেপাশের গ্রামের পরিবেশ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

জানা যায়, ঢাকার বাড্ডা এলাকার কায়সার আহমেদ কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে ২০০৯ সালে কপালেশ্বর গ্রামে ৭০ বিঘা জমিতে প্রোটিন হাউজ নামে একটি পোল্ট্রি খামার এবং ২০১৪ সালে টোক ইউনিয়নের কেন্দুয়াব গ্রামে ১৩০ বিঘা জমিতে ডায়মন্ড নামে আরো একটি খামার প্রতিষ্ঠা করেন। দুটি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১১ লাখ মুরগি পালন করা হয়, কিন্তু মুরগির উত্পাদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো আধুনিক প্রযুক্তি বা বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহার করা হচ্ছে না।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, আশপাশের জমিতে রাতের আঁধারে বর্জ্য এবং নিষ্কাশিত পানি ফেলায় জমিগুলোতে এখন আর কোনো ধরনের ফসল উত্পাদন হচ্ছে না। আর এসব দূষিত বর্জ্য ও নিষ্কাশিত পানির দুর্গন্ধে অনেকেই এখন গ্রাম ছাড়া। মুরগির বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির কারণে আশপাশে কাপালেশ্বর, নামিলা, নরদা, সোহাগপুর, বড়িবাড়ী, ভিটিপাড়া, ঝাওয়াদী, লোহাদী, বীরউজুলী, কেন্দুয়াব, ছাটারবর, বড়চালা, দীঘিরপাড়, উলুসারা, টোক নগরসহ কমপক্ষে ১৫টি গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এছাড়াও কপালেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়, কপালেশ্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কপালেশ্বর কিন্ডারগার্টেন, নামিলা আফতাবউদ্দিন মেমোরিয়াল স্কুল, নামিলা ফাজিল মাদ্রাসা, নামিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা খামারের জেনারেটরের বিকট শব্দে ও দুর্গন্ধে ক্লাসে বসে লেখাপড়া করতে পারছে না। পোল্ট্রি খামারের নিষ্কাশিত পানি ও বর্জ্য প্রতিনিয়ত মাটিতে ফেললে মাটির মধ্যে মিথেন গ্যাসের সৃষ্টি হয়। মিথেন গ্যাস গাছের শিকড় নষ্ট করে ফেলে। আর এ কারণে ঐসব জমিতে কোনো ধরনের ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। অপরদিকে পাশের আমুরী নদী বিলে এসব বর্জ্য ও নিষ্কাশিত পানি  ফেলায় মাছ মরে যাচ্ছে। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে লোকজনের নানা ধরনের চর্মরোগ হচ্ছে। এর প্রতিকার চেয়ে গত ২৯ মে এলাকাবাসীর পক্ষে আসাদুল্লাহ মাসুম জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

স্থানীয় লোকজনের দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ওই দুটি খামার ও আশপাশের এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ অ্যাডভোকেট মো. আমানত হোসেন খান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসমত আরা ও কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. রফিকুল ইসলাম। তারা স্থানীয় পরিবেশ দূষণের মাত্রা দেখে হতবাক হয়েছেন। পরে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার গাজীপুরের পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করার অনুরোধ করেন। তার অনুরোধের প্রেক্ষিতে গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক শেখ মুজাহিদ সরেজমিনে বিষয়টি তদন্ত করেন। তিনি জানান, তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া ছাড়পত্রের শর্ত ভঙ্গ করেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠানো হবে।

প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কায়সার আহমেদ বলেন, এলাকাবাসীর এসব অভিযোগ সঠিক নয়। আমার প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে কোনো নদী, খাল বা বিল নেই। কোনোরকম পরিবেশ দূষণ হচ্ছে না। সরকারি অনুমতি নিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি চলছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সব ব্যবস্থাই আছে। এখানে অর্গানিক ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরির কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে। একটি মহল ব্যবসায়িক সুবিধা না পেয়ে নানা অপপ্রচার করছে। কাপাসিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আমানত হোসেন খান বলেন, এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুর কবীর বলেন, স্থানীয় লোকজনের দুর্ভোগ লাঘবে সবরকম আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।