গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বোয়ালি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আলী আজমকে হাতকড়া ও ডাণ্ডা-বেড়ি পরিয়ে মায়ের জানাজায় নেওয়ার ঘটনায় সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় বইছে। সামাজিক মাধ্যমে এই ধরনের আইন সংশোধন সময়ের দাবি বলে অনেকেই অভিমত দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, এ ঘটনায় জেলকোডের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। কারাবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে কাউকে জানাজায় দাঁড়ানোর সময় ডাণ্ডা-বেড়ি ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। তারা বলছেন, কোনো মানুষের সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ না করার কথা সংবিধানে উল্লেখ আছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘গায়েবি’ মামলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২৯ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়। মামলায় চন্দ্রায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০০/১৫০ জনকে আসামি করা হয়। ঐ মামলায় অজ্ঞাত আসামি হিসেবে পহেলা ডিসেম্বর রাতে আলী আজমকে কালিয়াকৈরের পাবরিয়াচালা গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আলী আজম ছাড়াও পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল কুদ্দুস, আট নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সারোয়ার হোসেন আকুলসহ ১৬ জনকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। কালিয়াকৈর থানার ওসি আকবর আলী খান দাবি করেন, ঐ মামলায় কয়েক জনকে গ্রেফতারের পর তারা আলী আজমের নাম বলেছে।
আইন সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন বলেন, কাউকে জানাজায় দাঁড়ানোর সময় অবশ্যই হ্যান্ডকাফ বা ডাণ্ডা-বেড়ি খুলে দিতে হবে। আমাদের সংবিধান বলেছে, কোনো মানুষের সঙ্গে নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করা যাবে না। গাজীপুরের ? কালিয়াকৈর যেটা ঘটেছে সেটা সংবিধানের লঙ্ঘন হয়েছে। একই কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, জেল কোডে যাই থাকুক না কেন সংবিধানের ওপরে কিছু নেই। সংবিধান যেখানে বলছে, কাউকে জনসম্মুখে হেয় করা যাবে না, অমানবিক আচরণ করা যাবে না। সেখানে ডাণ্ডা-বেড়ি পরিয়ে মায়ের জানাজায় নিয়ে যাওয়া আইনের বরখেলাপ, সংবিধানের বরখেলাপ।
তবে গাজীপুর জেলা কারাগারের জেল সুপার বজলুর রশিদ আখন্দ বলেন, আসামি জেলের বাইরে গেছে, তাই নিরাপত্তার জন্য ডাণ্ডা-বেড়ি দিয়েছি। ওয়ারেন্টে দাগি-নিদাগি কোনো কিছু বলা থাকে না। আমি শুধু মামলার সেকশনগুলো (ধারা) দেখি। সেকশনে আছে, বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে ৩, ৪, ৫ ধারা; বিস্ফোরক আইনের মামলা আমি কি ছোট করে দেখব? ওখানে যারা তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাদের ডাণ্ডা-বেড়ি খোলার সুযোগ ছিল না। তাদের কাছে এর চাবিও ছিল না। আমরা আইনের বাইরে কোনো কাজ করিনি।
ডিসেম্বর মাসে আদালত বন্ধ থাকায় জামিনের আবেদন করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন আলী আজমের ভাই আতাউর রহমান। তিনি বলেন, আমার ভাই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। তাই মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল ভাই যেন জানাজা পড়ায়। এ কারণে আমরা হাতকড়া আর ডাণ্ডা-বেড়ি খুলে দিতে বলেছিলাম। স্থানীয় মুরুব্বিরাও পুলিশকে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু পুলিশের যে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ছিলেন তিনি এক হাত থেকে হাতকড়া খুলে দিলেও ডাণ্ডা-বেড়ি খোলেনি। ফলে বাধ্য হয়েই ঐভাবেই তিনি মায়ের জানাজা পড়িয়েছেন। আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে অন্য কোনো মামলাও নেই। শুধু বিএনপি করার কারণে তাকে গ্রেফতার করেছে।
হাতকড়া ও ডাণ্ডা-বেড়ি পরানো অবস্থায় মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। অনেকেই আইন সংশোধনের কথা বলছেন। অনেকেই দোষীদের শাস্তির কথা বলেছেন। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটা বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তাদের।
এদিকে আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এজাহারভুক্ত আসামি না হয়েও বিএনপি নেতা আলী আজম খানকে হাতকড়া ও ডাণ্ডা-বেড়ি পরিয়ে তার মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তার পরিবার ও দলীয় নেতাকর্মীরা। তারা এ ঘটনাকে চরম অমানবিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
এদিকে কারাবন্দী আলী আজমের বাড়িতে যাচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। শুক্রবার সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বোয়ালী ইউনিয়নের পাবুরিয়াচালা গ্রামের আলী আজমের বাড়িতে যাবেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও গাজীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, কারাবন্দি আলী আজমের মায়ের মৃত্যুতে তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিতে এবং সমবেদনা জানাতে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের নেতাকর্মীদের বিপদ আপদে তাদের পাশে থাকার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে প্রতিনিধি দলটি তার বাড়িতে যাচ্ছে।
