বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গল্প

শেষ কথন

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১০:২৭

ডাক্তার হবারও অনেক ঝামেলা। তবে আজ অনেকদিন পর একটু সময় বের করে সৌরভকে নিয়ে বেরিয়েছে নীলিমা। আপাতত নদীর পাড়েই খানিক চিনা বাদাম চিবিয়ে নেওয়া যাক। বেশ হাওয়া দিচ্ছে আজ চারপাশে। লাশ কাটাছেঁড়া করা আর বিভিন্ন রোগে নুইয়ে পড়া রোগীদের দেখতে দেখতে অনেকটা হাঁপিয়েই উঠেছিল নীলিমা। তবে আজ খানিকটা স্বস্তি। পাশে সৌরভ বসা, মাথার ওপর খোলা আকাশ আর নদীর জলে পা ডুবিয়ে রেখে দূরের ছইওয়ালা নৌকা দেখা...। একজন সাধারণ প্রেমিকা হিসেবে নীলিমার আর কী চাই?

‘নীলিমা।’ সৌরভের কণ্ঠ শুনে আড়চোখে নীলিমা তাকাল।

‘হুম... বল।’

‘আমি যদি কখনো তোকে ছেড়ে চলে যাই। তুই কী করবি?’

এমন প্রশ্নে নীলিমা খানিক ভ্রু কুঁচকালো। তারপর বলল, ‘তুই জীবনে আসার আগে যেমন ছিলাম সেরকম থাকব। আমি সাধারণ মেয়ে। কারো প্রতি অত ক্ষোভ পুষে রাখি না।’

সৌরভ স্মিত হাসি হেসে বলল, ‘তোর মতো আরো একজন ঠিক এই কথাই বলেছিল। মেয়েরা অত সহজ জিনিস না। ধোঁকাবাজদের অত সহজে ছেড়ে দেয় না। সেটা মেয়েরা নিজেরাও জানে না। আচ্ছা তোকে একজনের গল্প বলি। শোন...।’

‘কার গল্প?’

‘ডা. নিলুফার ইয়াসমিন...তুই ওনাকে সম্ভবত চিনতিস।’

‘হুম, চিনি। তিন বছর আগে আত্মহত্যা করেছিলেন। ফার্স্ট ইয়ারে ওনার দুটো কি তিনটি ক্লাস পেয়েছিলাম। তো হঠাত্ ওনার কথা কেন?’

‘আমার এই সাংবাদিকতার জীবনে অনেক মানুষের ইন্টারভিউ নিয়েছি। জানলে তুই অবাক হবি নিলুফার ইয়াসমিন আত্মহত্যা করার আট ঘণ্টা আগে আমিই ওনার জীবনের শেষ ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম।’

‘কী বলিস!’

‘উনি নামকরা মানুষ। ভেবেছিলাম ওনার আপয়েনমেন্ট নিতে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হবে। কিন্তু তেমন কোনো সমস্যাই হয়নি। তিনি আমায় ডেকেছিলেন ২৭শে শ্রাবণ বিকেলে। শীতল বৃষ্টিতে চারপাশ ভেজা স্যাঁতসেঁতে, সবকিছু কেমন যেন বিষণ্ন ছিল সেদিন। বাড়িতে ঢুকতেই বোঝা গেল প্রায় বিয়াল্লিশ বছরের কুমারী জীবনে ডাক্তারি করে অনেক টাকাই কামিয়েছেন। বাড়ির বর্ণনা নাইবা দিলাম। সাধারণ ঝাড়বাতির দিকেই মিনিটতিনেক তাকিয়ে ছিলাম আমি। তার কিছুক্ষণ পরেই বাড়ির মালকিনের দেখা পেলাম। নিলুফার ম্যাডামকে এর আগে দূর থেকেই দেখেছিলাম। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে তার এই পড়ন্ত যৌবনের সৌন্দর্য যেন মস্তিষ্কে বিঁধে যায়। তখন সেই সৌন্দর্যের কিছুটা ক্ষয়ে গেলেও বোঝা যায় একসময় তোর মতোই সুন্দরী ছিলেন।’

‘ওনার সৌন্দর্যের গল্প শোনাতে আমাকে বসিয়ে রেখেছিস?’

‘আরে না, শোন। যা বলছিলাম...তখন সবেমাত্র সাংবাদিকতার শুরু। তখনই ওনার মতো একজন মানুষের ইন্টারভিউ...মোদ্দা কথা খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। ইন্টারভিউতে সাধারণ যা প্রশ্ন মোটামুটি সবই করা শেষ। ইন্টারভিউ শেষ করে উঠে যাব...এমন সময় তিনি বলে উঠলেন, তোমার নামটা যেন কী? খানিক ভ্রু কুঁচকেই উত্তর দিলাম—সৌরভ। তিনি বললেন, ‘জীবনে এত ইন্টারভিউ দিলাম। আর সবার মূল আগ্রহ ছিল আমার বৈবাহিক ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। কিন্তু এই প্রথম দেখলাম কোনো সাংবাদিক আমার বৈবাহিক জীবন নিয়ে প্রশ্ন করল না।’

আমি বললাম, ‘ম্যাডাম অফিস থেকেই বারণ করে দিয়েছে এই বিষয়ে প্রশ্ন না করতে। আপনি নাকি তাতে বিরক্তবোধ করেন।’

‘হ্যাঁ, করতাম। তবে আর কদিনইবা বাঁচব। তাই না-বলা গল্পগুলো কাউকে বলেই যাই। তুমি তো কিছুই খেলে না। চা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে। আচ্ছা দাঁড়াও তোমার জন্য আমি চা বানিয়ে নিয়ে আসি।’

তিনি ফিরলেন তবে শুধু চা নিয়ে নয়...সঙ্গে শাড়িটাও বদলে এলেন। এবার আমি আর চোখ সরাতে পারছিলাম। পরনে সাদা সিফনের শাড়ি, গলায় মুক্তোর মালা, আবছা অন্ধকার ঘরে ওনাকে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির মতো লাগছিল।

তিনি আমায় চা দিয়ে নিজেও নিলেন। অতঃপর বলতে শুরু করলেন, ‘আজ আমার জন্মদিন। সেটা অনেকেই জানে না। কারণ অফিসিয়ালি আমার জন্মদিন ২৫শে ফেব্রুয়ারি, কিন্তু সে এই দিনটার কথা কখনোই ভুলত না। প্রতি সাতাশে শ্রাবণ সে আমার জন্মদিন ঘটা করে পালন করত। এই ঢাকা শহরেও আমার জন্য খুঁজে খুঁজে কদম ফুল নিয়ে আসত।’

‘কী নাম তার?’

‘বলছি। অপেক্ষা করো।’

আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালাম। তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমার এই বিয়াল্লিশ বছর অবিবাহিত থাকার কারণ সে। মেডিক্যাল কলেজের ফার্স্ট সেমিস্টারের রেজাল্ট অবধি খারাপ করেছিলাম তার কথা ভাবতে ভাবতে। কিন্তু একসময় আমি তার কাছে পুরোনো হয়ে গিয়েছিলাম। ছেলেদের রুচি খুব গতিশীল...ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। তারপর বর্ষার এক বিকেলেই রেজিস্ট্রি করা চিঠি এলো। তার হাতের লেখা ছিল অসাধারণ, গোটা গোটা অক্ষরে লেখা—তার নাকি আর আমাকে মনে ধরছে না। সে মনপুরা নামের অন্য এক সুন্দরীকে বিয়ে করবে। করুক তাতে কী...। আমি আমার মতো থাকব...আমি সাধারণ মেয়ে। কারো প্রতি অত ক্ষোভ পুষে রাখি না। তাকে ভুলে যাবার চেষ্টা করছিলাম।’

ডাক্তার হিসেবে জীবনে পোস্ট মর্টেম করতে হয়েছে। এই কাজটাই ডাক্তারি জীবনে খুব খারাপ লাগত করতে। মৃত মানুষগুলোর শরীর কাটাছেঁড়া করা...তাদের অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো কেটে বের করা খুব বিচ্ছিরি ব্যাপার। কিন্তু জীবনে একজনের পোস্ট মর্টেম আমি খুব আগ্রহ নিয়ে করেছিলাম।...তার পোস্ট মর্টেম...।’

কথাটা বলে খানিক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমি খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার পোস্ট মর্টেম?’

‘তার, যে আমাকে ছেড়ে এক বর্ষার বিকেলে চলে গিয়েছিল। তার হূদপিণ্ডটা আমি বের করে দেখেছিলাম...তার মনে আদৌ ভালোবাসার কোনো রেশ ছিল কি না। তার দেহটা কেটেছিঁড়ে দেখতে খুব আনন্দ হচ্ছিল...। আমার ভেতরে যে গভীর সূক্ষ্ম ক্ষোভ জমা হয়েছিল, সেটা বোধহয় উগড়ে দিতে পেরেছিলাম। আর মজার ব্যাপার কী জানো—সে খুন হয়েছিল তার স্ত্রী মনপুরার হাতেই। হয়তো মনপুরার ওপর থেকেও তার মন উঠে গিয়েছিল। আর সেটা জানতে পেরে তার স্ত্রী তাকে মেরে দিল...।’

কথাগুলো বলে তিনি ঘর ফাটিয়ে হাসতে লাগলেন। যেন এতক্ষণ যা বললেন সব পাগলের প্রলাপ। তারপর নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে বললেন, ‘তোমাকেই কেন এত কথা বললাম জানি না। হয়তো তার সঙ্গে তোমার খানিকটা মিল পেয়েছি তাই। আমার পরনের শাড়িটাও সে উপহার দিয়েছিল, প্রতি জন্মদিনে আমি এই শাড়িটা পরি। নিজের জীবনটাকে নিয়ে অনেক জুয়া খেলেছি। আর খেলতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’ খানিক বিরতি দিলেন। বললেন, ‘তুমি এবার আসতে পার।’ তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন...এগুলোই ছিল ওনার জীবনের শেষ কিছু কথা। ইন্টারভিউটি আর ছাপানো হয়নি। অফিস যদি আমাকে রেসকিউ না করত তাহলে হয়তো ওনার আত্মহত্যার কেসে আমি ফেঁসে যেতাম। কিন্তু আজও আমার ডায়েরিতে ওনার সম্পূর্ণ ইন্টারভিউটা লেখা আছে। যার শিরোনাম দিয়েছিলাম, ‘সি হ্যাজ রিটেন হার ডেথ সেনটেন্সেস।’

নীলিমা এতক্ষণ উদ্ভ্রান্তের মতো কথা শুনছিল। সৌরভের কথা শেষ হতেই মনে হলো—সমস্ত চরাচর কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সৌরভ বলল, ‘চল আজ উঠি সন্ধ্যা নেমে আসছে।’

নীলিমা ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা নিলুফার ম্যাডামকে যে ঠকিয়েছিল ম্যাডাম তার নাম বলে   যায়নি?’

সৌরভ পশ্চিম আকাশের গোধূলির শেষ আভার দিকে তাকিয়ে থেকে ম্লান হেসে বলল, ‘বলে গিয়েছিলেন বইকি। কাকতালীয়ভাবে তার নামও ছিল—সৌরভ।’

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন