তিনবার বন্ধের পরও চলছে সেই ইটভাটা, ডিসিসহ চারজনের নামে মামলা

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:৩০

ময়মনসিংহ জেলার ও গফরগাঁও উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উচ্চ আদালত আদেশ দিয়েছিলেন অবৈধ ইটভাটাটি বন্ধ করতে। হাইকোর্টের আদেশ কার্যকর না হওয়ায় ইটভাটায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকসহ চার কর্মকর্তার নামে আদালত অবমাননার একাধিক নোটিশ পাঠানো হয়। পরে এ ঘটনায় হাইকোর্টে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়েছে।

এতকিছুর পরও উপজেলার নিগুয়ারি ইউনিয়নের চামুর্থা গ্রামে স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হাবিবুল্লাহ ও তার সহযোগিদের স্থাপিত অবৈধ ইটভাটাটি চলতি মৌসুমে ভিন্ন নামে চালু করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে, লোকালয়ে, তিন ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে এটি। উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্য করে, নাম পরিবর্তন করে অবৈধ ইটভাটাটি পুরোদমে চালু থাকায় হতাশ কৃষক ও গ্রামবাসী।

হাবিবুল্লাহ, আসাদুল্লাহ, নুরুল্লাহ, শহিদুল্লাহ, মিজান ও জামান নামে ছয় ব্যক্তির যৌথ মালিকানায় ২০১৮ সালে গ্রামের শামছুল হক ফাজিল মাদ্রাসার পাশের লোকালয়ে তিন ফসলি জমিতে এমবিবি নামক অবৈধ ইটভাটাটি স্থাপন করা হয়। জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রবিহীন এই ইটভাটাটি বন্ধের জন্য এলাকাবাসী পরিবেশ অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন ও গফরগাঁও উপজেলা প্রশাসনে বার বার ধর্না দেয়।

কিন্তু কোনো প্রতিকার না পেয়ে কৃষির জন্য ক্ষতিকর এই ইটভাটাটি বন্ধে এলাকাবাসীর পক্ষে আব্দুল্লাহ হাছান নামে এক ভুক্তভোগী গত বছরের ১৬ নভেম্বর হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করেন। বিচারপতি এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ইটভাটাটি বন্ধের আদেশ দেন। এরপর গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

মালিকপক্ষ ভাটাটি আবারো চালু করলে বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্রে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি আরো একবার ইটভাটাটি বন্ধ করে দেয় প্রশাসন।

চলতি মৌসুমে আবার চালু করা হলে ভুক্তভোগীদের উকিল নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ নভেম্বর প্রশাসন মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ইটভাটাটি বন্ধ করে দেয়।

স্থানীয় এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, হাইকোর্টের আদেশ পাওয়ার পর প্রশাসন ইটভাটাটি তিনবার বন্ধ করে দিলেও কখনোই তা বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের লোকজন হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়নের নামে প্রহসন করে। প্রশাসনের লোকজন চলে যাওয়ার পরপরই ইটভাটাটি আবার চালু করা হয়। মালিকপক্ষ এটি পুনরায় চালু করে এলাকাবাসীকে হুমকি দিয়ে বলে, ‘কোথায় তোমাদের আদালত।’

আদালতের আদেশ কার্যকর না করায় রিট পিটিশন করা আব্দুল্লাহ হাছান গত ২২ জানুয়ারি ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক, পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক, গফরগাঁওয়ের ইউএনও ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আদালত অবমাননার মামলা করেন। তিনি আদালতের আদেশ কার্যকর করেতে ওই কর্মকর্তাদের তিনটি উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন।

ছবি: ইত্তেফাক

শুক্রবার (২৩ ডিসেম্বর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ইটভাটাটি পুরোদমে চালু রাখা হয়েছে। নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘বিবিবি’।

গ্রামবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, এই ইটভাটা স্থাপিত হওয়ার পর থেকে তাদের গাছগুলো থেকে ঝরে যাচ্ছে আম, লিচু, পেয়ারা ও ডাবের গুটি। নষ্ট হচ্ছে শাকসবজি ও ফসলের জমি। মারা যাচ্ছে কবুতরসহ গৃহপালিত হাঁস-মুরগি। শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন গ্রামের বৃদ্ধ থেকে শিশু এবং ইটভাটার পাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এর পাশে শীলা নদীতে মাছের খাবারও কমে গেছে।

ভুক্তভোগী আমানুল্লাহ বলেন, এই অবৈধ ইটভাটা পুরোপুরি বন্ধ করা না হলে একসময় আমাদের কৃষি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। সর্বোচ্চ আদালতের রায় যদি প্রশাসন না মানে, আমরা যদি বিচার নাই পাই, তবে কোথায় যাবো আমরা?

রিট পিটিশনকারি আব্দুল্লাহ হাছান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অমান্য করে এই ইটভাটার কার্যক্রম বেআইনিভাবে চালু রাখতে প্রশাসনের লোকজন সহযোগিতা করছে। উচ্চ আদালতের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাতে প্রশাসনের লোকজন নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। তাই আমি সংশ্লিষ্টদের নামে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেছি।

রিট পিটিশনকারির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. হারুনুর রশিদ বলেন, হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। উচ্চ আদালতের আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টাষ্টমূলক শাস্তি দাবি করবো আদালতের কাছে।

ইটভাটার মালিক মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ইটভাটা কীভাবে চলছে এটা পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানেন। আপনারা ময়মনসিংহ পরিবেশ অধিদপ্তর অফিসে গিয়ে খোঁজ নেন।

পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মিহির লাল সরদার বলেন, ইটভাটাটি বন্ধ করার ব্যাপারে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাফিস্তার রহমান বলেন, আমি জেলা প্রশাসক হিসেবে এ জেলায় নতুন যোগদান করেছি। আদালতের আদেশ থাকলে এই ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এসকে