রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের প্রায় ৯০ শতাংশ বাসাবাড়িতে নেই কার্যকর সেপটিক ট্যাংক। যার কারণে সিটি করপোরেশনের ড্রেনের মাধ্যমে সরাসারি এসব পয়োবর্জ্য পড়ছে খাল বা লেকে। এতে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ হয়ে লেক বা খাল ধ্বংস হচ্ছে। আর এই দূষণ ঠেকাতে বাসাবাড়িতে কার্যকর সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে কীভাবে দূষণ ঠেকানো যায়, সে বিষয়ে মডেল তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে উত্তর সিটি করপোরেশন। একটি রোডম্যাপের মাধ্যমে প্রত্যেক বাসাবাড়িতে এসব স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বাস্তবায়নের জন্য কাজ শুরু করেছে তারা। এই উদ্যোগে যেসব বাসাবাড়ির মালিক সাড়া দেবেন, তাদের স্যুয়ারেজ বিল মাপেরও চিন্তা করা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মূলত বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্যের লাইনের ব্যবস্থাপনা করে ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু এসব এলাকায় বেশির ভাগ বাসাবাড়িতে লাইন না থাকায় ও সেটি তৈরি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ডিএনসিসি এলাকায় নিরাপদ স্যানিটেশনের জন্য এবং লেক-খাল বাঁচাতে একটি কমিটি করা হয়েছে। যেখানে রয়েছে ঢাকা ওয়াসা, রাজউক, আইসিডিডিআরবি, ইউনিসেফ, ডিএনসিসি এবং গুলশান, বনানী সোসাইটির লোক। ডিএনসিসি ইতিমধ্যে রোডম্যাপ অনুযায়ী এসব এলাকায় কী পরিমাণ বাসাবাড়িতে কার্যকর সেপটিক ট্যাংক রয়েছে, তা নির্ধারণ করা জন্য জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করেছে। ডিএনসিসির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৪ হাজার বাড়িতে চালানো এ জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাড়িতেই এই ‘কার্যকর সেপটিক ট্যাংক’ নেই। অথচ এসব ধনী এলাকার মানুষের জন্য এটি বানানো সম্ভব। আর এ জরিপের জন্য অর্থায়ন করেছে ইউনিসেফ। জরিপের পর পরবর্তী কাজ হিসেবে রাখা হয়েছে এই ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বাসাবাড়ি অফিসে কী ধরনের ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কার্যকর সেটি নির্ধারণ করা। আর এ কাজটি করবে এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলিজি, থাইল্যান্ড। ইউনিসেফের তত্ত্বাবধানে এটিতে অর্থায়ন করবে বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। এই সার্ভেটির পর জানা যাবে বস্তি থেকে ১০ তলা বাড়ির জন্য স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার জন্য কোনটি উপযোগী। এরপর পাইলটিং প্রকল্প হিসেবে কিছু জায়গায় এটি স্থাপন করবে উত্তর সিটি করপোরেশন।
এই স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের দাম শুরু ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা। আর এটি প্রত্যেক বাসায় লাগানোর জন্য উত্সাহিত করবে ডিএনসিসি। গাড়ি পার্কি এলাকায় চাইলেও যে কেউ লাগাতে পারবে বলে জানায় তারা। যারা এটি লাগাবে তাদের আর সুয়ারেজ বিলও দিতে হবে না বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা কমডোর এস এম শরিফ-উল ইসলাম বলেন, আলাদা লাইন না থাকায় স্যুয়ারেজের এই পানিটা আমাদের ড্রেনে আসে। সেটি যায় লেকে। আর এ জন্য আমরা কার্যকর স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসিয়ে পানি শোধন করলে আর পরিবেশ দূষণ হবে না। এছাড়া পানি ছাড়া যেসব বর্জ্য থাকবে এটি প্রাইভেট কোনো কোম্পানিকে পরিষ্কারের জন্য দেওয়া হবে। এছাড়া আমরা ছোট ছোট জায়গা খুঁজছি, যেখানে এই ময়লাগুলো রিসাইকেল করে এটি ব্যবহার করা যায় কি না—এটি নিয়েও ভাবা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, কার্যকর সেপটিক ট্যাংক না থাকায় সিটি করপোরেশনের সারফেস ড্রেনের মাধ্যমে এসব পয়োবর্জ্য লেকে পড়ছে। আবার এগুলো নদীতেও যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে আমাদের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশেও ব্যক্তি উদ্যোগে অনেক কিছু হচ্ছে। প্রত্যেক বাসাবাড়িতে যদি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসানো যায় তাহলে আমাদের খাল ও লেকগুলো বেঁচে যাবে। আমরা যদি বাসাবাড়িতে জেনারেটর বসাতে পারি, তাহলে এটিও বসাতে পারব। আমার কথা হচ্ছে, কেউ খাল-লেকে এসব পয়োবর্জ্যের লাইন দিতে পারবে না।
