প্যারিস রোড ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের কোনো রাস্তা নয়। এটি অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ প্রাচ্যের ক্যামব্রিজ নামে খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। গগনশিরীষ নামের সুউচ্চ গাছ দিয়ে রোডের দু‘পাশ সজ্জিত। তাই দেখা মাত্রই যে কারও চোখ জুড়িয়ে যায়। ৫৭ বছরের পুরোনো এই প্যারিস রোড বহন করে চলেছে অনেক কালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
প্যারিস রোড বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোরই একটি অংশ। গগনশিরীষ নামের সুউচ্চ গাছগুলো রাস্তার দু’ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। ধারণা করা হয়, এই গাছগুলো ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আনা হয়েছিল। তাই রাস্তাটির নামকরণ করা হয়েছে 'প্যারিস রোড'।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-আন্দোলন যেমন প্যারিস রোড ছাড়া প্রাণ পায় না, তেমনি ক্যাম্পাসে প্রিয়জনের ভালোবাসাও প্রাণ পায় না প্যারিস রোড ছাড়া। প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম অনুভূতিও প্যারিস রোডের শীতল ছায়ায় হাঁটার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। আবার বিরহ-বিচ্ছেদের যন্ত্রণাও ভাগাভাগি করতে চায় রাতের নির্জন প্যারিস রোডের শূন্যতার মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা ফটক থেকে শেরেবাংলা ফজলুল হক হল পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত রাস্তাটি প্যারিস রোড। রাস্তার দুপাশে গাছগুলো যেন রাস্তার প্রহরী। অনেকটা ওপরে গিয়ে ডালপালা মেলেছে চারপাশে। দুই পাশের গাছের ডালপালা রাস্তার মধ্যে শূন্যে আলিঙ্গন হওয়ার নেশায় ব্যাকুল। এ যেন প্রকৃতির শরীরী খেলা। গাছের চিরচিরে ঘন পাতা রাস্তায় মেলে ধরেছে এক লম্বা শামিয়ানা।
এত বিশেষত্ব থাকলেও প্যারিস রোডের জন্মের ইতিহাস কিন্তু অনেকটা সাদামাটা। ১৯৬৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের এই গগন শিরীষ গাছ লাগানো হয়। তৎকালীন উপাচার্য এম শামসুল হক ফিলিপাইন থেকে কিছু গাছ নিয়ে আসেন। তিনি এ গাছগুলো রোপণের দায়িত্ব দেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী মোহাম্মাদ ইউনুসকে। তার হাত ধরেই লাগানো হয় গাছগুলো। তখন এটি ছিল নেহাৎ বৃক্ষরোপণের একটি উদ্যোগ।
জনশ্রুতি আছে, একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের কিছু ছবি তুলে তার এক বন্ধুর কাছে পাঠায়। বন্ধু দেখে বিস্মিত হয়ে বলে এটি কোন দেশের ছবি। সেই শিক্ষার্থী তখন বলে দেয় এটা আমাদের ক্যাম্পাসের। তার মধ্যে অন্যতম ছিল প্যারিস রোডের ছবিটিও। এরকম আরও অনেক গল্প রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে এলে প্রথমেই মনে পড়ে মমতায় ঘেরা রাস্তাটিকে এক নজর দেখে আসি। রাতে হঠাৎ যদি কারো চোখ থেকে ঘুম উধাও হয়, কিংবা বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় গরমে জীবন যায় যায় অবস্থা, সেই মুহূর্তে অনেকের মনে পড়ে প্যারিস রোডের শীতল হাওয়ার আত্মাটাকে একটু জুড়িয়ে নেওয়ার কথা।
কুমিল্লা থেকে ঘুরতে আসা মো. রায়হান বলেন, এই রোডটির কথা আমার বড় ভাইয়ের মুখে অনেক শুনেছি। কিন্তু আগে কখনো দেখা হয়নি। আজ দেখে মনে হচ্ছে সত্যিই এক অপরূপ সৌন্দর্যময় রাস্তা এবং এটি ভুলে থাকার মতো নয়।
খুলনা থেকে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে আসা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমার বাসা খুলনা হলেও আমি থাকি ঢাকাতে। ঢাকা শহরে এরকম পরিবেশ পাওয়া যায় না। এখানকার প্রতিটি স্থাপনায় ভালো লেগেছে। তবে প্যারিস রোড সবার ওপরে।
শুধু দর্শনার্থী নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ রোডটিকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে। আব্দুল কাইয়ুম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি ফেসবুক চালাই আর আমার পোস্ট করা বেশিরভাগ ছবিই প্যারিস রোড থেকে তোলা। আমরা বন্ধুরা মিলে বিকেলের দিকেই বেশি আড্ডা দেই এখানে।
