বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৫ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

আয়োজকদের কাঁধেই খরচের বোঝা, অনুদান না থাকায় এবার লিট ফেস্টে টিকিট চালু

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:০৪

ঢাকায় আবারও বসছে শিল্প-সাহিত্য আর চিন্তার আন্তর্জাতিক সম্মিলন। আগামী ৫ থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে 'ঢাকা লিট ফেস্ট'-এর দশম আসর। তবে বিগত বছরগুলোতে এই আয়োজনে সরকারের সহযোগিতা থাকলেও এবার সেই সহযোগিতা মেলেনি। উপরন্তু বাংলা একাডেমিকে ভেন্যু ভাড়া হিসেবে আয়োজকরা অন্তত ২১ লাখ টাকা দিয়েছেন। সর্বোপরি খরচের বোঝা চেপেছে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজকদের কাঁধেই। বাধ্য হয়েই এবার তারা দর্শকদের জন্য টিকিটিং চালু করেছেন।

আয়োজকরা জানান, ঢাকা লিট ফেস্টের এবারের আসরে অংশ নেবেন তুরস্কের নোবেলজয়ী বিখ্যাত লেখক ওরহান পামুক। এমন দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক শিল্পী-সাহিত্যিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ যোগান প্রয়োজন হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও অনেকে এতে সহযোগিতা করে থাকেন। অন্যদিকে প্রতিবার সরকারি অনুদান মিললেও এবার তা হয়নি। একইসঙ্গে ভেন্যু ভাড়া হিসেবে ২১ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়টিও তাদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোভিড পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে অনুদানের বিষয়টিতে অপারগতা ছিল। তবে বাংলা একাডেমি কোন প্রক্রিয়ায় ভেন্যু ভাড়া নির্ধারণ করেছে সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয় কিছু জানে না।

করোনা মহামারীর আগের বছরগুলোতে এমনই সরব ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা লিট ফেস্ট। ছবি: সংগৃহীত

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো শর্ত বা কড়াকড়ি আরোপ করা হয় না। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষই ভাড়া চূড়ান্ত করে। এক্ষেত্রে একাডেমির নির্বাহী পরিষদের বৈঠক ডেকে আন্তর্জাতিক শিল্পী-সাহিত্যিকদের এই আয়োজনকে আর্থিক মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়।

এদিকে বাংলা একাডেমির সচিব এ এইচ এম লোকমান বলছেন, ভেন্যু ভাড়া দেওয়া ছাড়া লিট ফেস্টের সঙ্গে একাডেমির আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিবারই অর্থের বিনিময়ে ভেন্যু ভাড়া দেওয়া হয়। ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজকেরা মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন নিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানে তাদের দাবি হিসেবে বিনামূল্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গন ব্যবহার করতে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ ছিল। একই সঙ্গে অনুদানের বিষয়ও ছিল। তবে মন্ত্রণালয় তাদের জানিয়েছে, বাংলা একাডেমির নির্বাহী পরিষদ যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই চূড়ান্ত। ভাড়া নেওয়া বা না নেওয়ার বিষয়টি একাডেমির নির্বাহী পরিষদেরই সিদ্ধান্ত। এবার নির্বাহী পরিষদ ভাড়া কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।’

এ এইচ এম লোকমান উল্লেখ করেন, 'এবার ২১ লাখ টাকায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ লিট ফেস্ট আয়োজনের জন্য দেওয়া হয়েছে। তারা আমাদের অগ্রিম ১০ লাখ টাকার চেকও দিয়েছেন। তবে তারা এবার সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদান পাননি বলে শুনেছি।'

আয়োজকরা জানান, সরকারি কোনো সহায়তা না পাওয়া এবং বাংলা একাডেমি অনেকবেশি টাকা ভাড়া নেওয়ার কারণে দর্শকদের জন্য টিকিট বিক্রি চালু করতে হয়েছে। এর আগে লিট ফেস্টের প্রতিটি আসরে বিনামূল্যে প্রবেশের ব্যবস্থা রাখা হতো। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করে যে কেউ আসরে প্রবেশ করতে পারতেন।

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে লিট ফেস্ট আয়োজন করা হয়নি। এবার ১ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশু ছাড়া সবার জন্য তিন ক্যাটাগরিতে টিকিট রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকা, নিয়মিত দর্শকদের ৫০০ টাকা এবং ভিআইপি ক্যাটাগরিতে ৩ হাজার টাকার টিকিট রাখা হয়েছে। তবে চার দিনের প্যাকেজে টিকিট কাটলে খরচ কিছুটা কমবে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের চার দিনে দিতে হবে ৫০০ টাকা, নিয়মিত দর্শকদের ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ভিআইপি ক্যাটাগরিতে ১০ হাজার টাকার টিকিট কাটতে হবে।

সিরিয়ার বিখ্যাত কবি আদুনিসও এসেছিলেন ঢাকা লিট ফেস্টে। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে লিট ফেস্টে টিকিট চালুর ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, শিল্প-সাহিত্যের এমন আয়োজনে অর্থের বিনিময়ে প্রবেশ করতে হলে তা একধরনের বৈষম্য। তবে কবি ও তরুণ চিন্তক সাদ রহমান মনে করেন, 'একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে টিকিট রাখার বিষয়টি অযৌক্তিক নয়। এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনগুলোয় মানুষ টিকিট কেটে অর্থ ব্যয় করেই প্রবেশ করে এবং তা উপভোগ করে।' তিনি বলেন, 'প্রতিবার এ আয়োজনে বিনামূল্যে প্রবেশ করা গেছে বলেই সহসা টিকিট চালুর বিষয়টি অনেকেই সহজে গ্রহণ করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে টিকিট বিক্রির বিষয়টি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। দেশি-বিদেশি অতিথি যারা আসেন, তাঁদের থাকা-খাওয়ার খরচ ও সম্মানী আয়োজকদেরকেই বহন করতে হয়। এ জন্য অর্থের প্রয়োজন।’

লিট ফেস্ট আয়োজনের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, 'গত দুই বছরের আয়োজনে আমরা ভাড়া নিয়েছি। এর আগেও ভাড়া নেওয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য চাইলে একাডেমির হিসাব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।'

তবে অন্য একটি সূত্র বলছে, আগে বাংলা একাডেমি লিট ফেস্টের আয়োজকদের কাছ থেকে সরাসরি ভেন্যু ভাড়ার টাকা না নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান থেকে কেটে রাখতো। এই বিষয়ে কথা বলতে বাংলা একাডেমির হিসাব বিভাগের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

উৎসবের ব্যয় প্রসঙ্গে ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালকের একজন কাজী আনিস আহমেদ বলেছেন, 'উৎসব আয়োজনে এবার সব মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। এই মুহূর্তে সঠিক পরিমাণ বলাটা কঠিন। শুধু এটুকু বলি, এটা কয়েক কোটি টাকার আয়োজন। অন্যদিকে করোনা মহামারীর পর সবক্ষেত্রেই স্থবিরতার একটা প্রভাব রয়ে গেছে, তাই সরকারও বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে কৃচ্ছ্রতাসাধনের চেষ্টা করছে, যে কারণে এবার অনুদানের ব্যাপারে সাড়া পাওয়া যায়নি।'

লিট ফেস্ট আয়োজনের খরচের খাতগুলো ব্যাখ্যা করে আনিস আহমেদ বলেন, 'শুধু ভেন্যু ভাড়া বাবদই আমাদের ২১ লাখ টাকা লাগছে। আমাদের সবচেয়ে বেশি খরচ হয় বিদেশ থেকে লেখকদের আনতে। যারা আসেন তাদের জন্য আমাদের কোটি খানিক টাকা খরচ হয়ে যায়। এর বাইরেও অনেক রকম আয়োজন আছে।'

ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালক— কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সাজ সিদ্দিকী ও আহসান আকবর। ছবি: সংগৃহীত

তিনি বলেন, 'খরচ ওঠানো বা আয়ের উদ্দেশে আমরা এই উৎসব করি না। আমরা তিন পরিচালক— আমি কাজী আনিস, সাদাফ সাজ ও আহসান আকবর ব্যক্তিগতভাবেও এখানে অর্থায়ন করি। এবার সরকারি অনুদানও পাইনি। তাই টিকিট চালু করা ছাড়া অন্যকোনো উপায়ও ছিল না, কারণ ঢাকা লিট ফেস্ট (ডিএলএফ) একটি অলাভজনক ট্রাস্ট। আসলে আন্তর্জাতিক অনেক ফেস্টিভ্যালেই টিকিটিংয়ের রীতি প্রচলিত। আমরা প্রত্যাশা করি আমাদের পুরনো দর্শক-পাঠক-সাহিত্যানুরাগীরা এবারও লিট ফেস্টে আসবেন। তাদের জন্যই এত তোড়জোড়, পরিশ্রম।'

কাজী আনিস আরও বলেন, 'যে ব্যক্তি টিকিট কেটে প্রবেশ করবেন, তিনি কিন্তু এখানে এসে সাহিত্য ও সাহিত্যিক-লেখক-চিন্তকদের সম্মান দেখাবেন।'

ঢাকা লিট ফেস্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, ঢাকা ও বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরার অঙ্গীকার নিয়ে ২০১১ সালে এই উৎসবের সূচনা হয়। উৎসবটি মূলত সাহিত্যের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখলেও ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজকেন্দ্রিক ফিকশন এবং সাহিত্যিক নন-ফিকশন; কবিতা ও অনুবাদ; বিজ্ঞান ও গণিত; দর্শন এবং ধর্ম-সংক্রান্ত সংস্কৃতি এবং ধারণা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করে ও তা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করে।

ইত্তেফাক/এসটিএম