২০২২ সালের এই শেষ সপ্তাহটি পাকিস্তানে সহিংসতাপূর্ণ ছিল। প্রায় প্রতিদিনই পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যেই দেশটির ছয়জন সরকারি কর্মী নিহত হয়েছেন। মূলত পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং এরই মাঝে জঙ্গি ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ এইসব সহিংসতার মূল কারণ।
তবে এ সহিংসতার দরুন পাকিস্তানে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও খারাপ হচ্ছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক সম্পর্ককেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে এইসব জঙ্গী কার্যক্রম। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর।
এরই মধ্যে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)ও সহিংসতার পথেই হাঁটছে এবং ইতোমধ্যে তাদের সহিংস কার্যক্রমে একজন সৈনিক নিহত হয়েছেন।
জঙ্গিগোষ্ঠী এবং বেলুচ লিবারেশন আর্মি যদি একে অপরের সঙ্গে জোট গঠন করে তাহলে তা ইসলামাবাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হবে।
পাকিস্তান সরকার এখনো তাদের দেশের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে বিদেশিদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণ করতে পারে নি। এ বিষয় অপ্রমাণিত হলেও, এটা সকলেরই জানা যে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) আফগানিস্তানে তার নিরাপদ আশ্রয়স্থলে থেকে সব কাজ করে যাচ্ছে।
টিটিপি এখন পাকিস্তানের উত্তরে খাইবার পাখতুনখোয়ার উপজাতীয় এলাকা থেকে শুরু করে আরব সাগরের দক্ষিণ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।
বেলুচ জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সাথে এর কথিত জোটের কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। উভয়েই একই ভূখণ্ড এবং একই কৌশল অবলম্বন করছে এবং সেইসাথে সেনাবাহিনীকেও একটু হলেও ভীত করে তুলেছে।
টিটিপি এবং বেলুচ জঙ্গিদের একত্রিত হওয়ার সম্ভাবনা রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর হবে এবং এমনটি হলে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তা রক্ষা করা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্র ছিল তারা সবাই সতর্ক হয়ে রয়েছে। কারণ পাকিস্তানের সমস্যা ইতোমধ্যেই ইরানে ছড়িয়ে পড়েছে।
আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন তালেবানেরা টিটিপিকে আফগানিস্তানে থাকতেও দিবে না, আবার উচ্ছেদ ও করবে না। চীন জঙ্গিবাদ ও সহিংসতা দ্বারা উত্তেজিত, যা ভারত মহাসাগরে চীনের প্রবেশাধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এ কারণেই এ দেশ বহু কোটি টাকার সিপিইসি স্থাপন করেছে।
পাকিস্তান বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত, এ বেড়াজাল থেকে দেশটি কোনক্রমেই বের হতে পারছে না। টিটিপি এবং ইসলামিক রাষ্ট্রের (আইএস) দক্ষিণ এশীয় সংস্করণ, বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে এ দেশকে লড়াই করতে হবে। কিন্তু মনে হচ্ছে কখন আলোচনার পথ ছেড়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এ বিষয়টি পাকিস্তান সরকার এখনও বুঝতে পারছে না। বেলুচিস্তানের বর্তমান সহিংসতার জন্য টিটিপিকে দায়ী করছে পাকিস্তান সংবাদ মাধ্যম।
বিশ্লেষকরা খেয়াল করছেন, যে ইসলামাবাদ একসময় বিদেশি হস্তক্ষেপে দেশে সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে বলে দাবি করেছিল, সে রাষ্ট্র এখন এ ব্যাপারে আর কোন আলোচনা করতে চায় না।
পাকিস্তানের আদর্শ, বর্তমান সমস্যাগুলোকে আরো জটিল করে তুলেছে। জঙ্গিবাদ এবং বিক্ষোভ উভয়ই ধর্মভিত্তিক এবং ইসলামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু এসবই পাকিস্তানি সরকারকে বেশ প্রভাবিত করছে এবং দেশের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে সরকার প্রধানত কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু এর ফলে জঙ্গিবাদ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এটি দেশের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সমস্যার সমাধানে বাধার সৃষ্টি করেছে।
জামায়াত-ই-ইসলামীর স্থানীয় প্রধান মাওলানা হিদায়াতুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিবাদ আন্দোলন এবং অর্থনৈতিক দুর্দশার শিকার হাজার হাজার পরিবার তাদের দুর্দশার জন্য ফেডারেল সরকার এবং চীন উভয়কেই দায়ী করে।
ইসলামাবাদ এবং বেইজিং উভয়েই সিপিইসি এর খারাপ প্রচারে উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। এটি চীনের বৃহত্তর বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর পরবর্তী ধাপ।
জঙ্গিবাদ যদি রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হয় এবং আরো জটিলতর হয়ে বহু বছর ধরে চলতে থাকে, তাহলে বলা যায় বেলুচিস্তানের বিক্ষোভের ইতিহাস ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টির সাথে যুক্ত।
তখন বেলুচদের জোরপূর্বক পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীর বন্দুকের নলের মুখে তাদেরকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল। লক্ষ্য লক্ষ্য লোককে হত্যা করা হয়েছে, অপহরণ করা হয়েছে আরো অনেককে। গতকাল ক্ষুব্ধ উপজাতীয় নেতারা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের দায়িত্ব অর্পণ করেছেন শিক্ষিত যুবকদের হাতে।
শাসনের অবহেলা এবং অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় অর্থনৈতিক বঞ্চনা বেলুচিস্তানের সমস্যাকে আরো খারাপ করে তুলেছে।
সবচেয়ে বড়, অথচ অল্প জনবহুল প্রদেশটি এখন সিপিইসি এবং চীনের কৌশলগত পরিকল্পনার চাবিকাঠি। এর গোয়াদর বন্দর চীনকে আরব সাগরে প্রবেশাধিকার দেয়। জঙ্গিবাদ এবং বর্তমান বেসামরিক বিক্ষোভের ফলে এখানে অনেক চীনা নিহত হয়েছে।
বেলুচিস্তান এবং গোয়াদরের সংঘর্ষের জন্য চীন তার নিজের দোষ এড়াতে পারে না। প্রায় দুই মাস ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়া, হক দো তেহরিক (এইচডিটি)-এর দাবি, অবিলম্বে গোয়াদরের জলসীমানায় অবৈধ ট্রলিং বন্ধ করতে হবে।
বেলুচ জেলেরা চীনের উন্নত মানের মাছ ধরার ট্রলার দ্বারা বৈষম্যের শিকার এবং হুমকির সম্মুখীন। তাছাড়া উচ্চ-নিরাপত্তাযুক্ত চেকপয়েন্টগুলি তাদের মাছ ধরার কার্যকলাপে বাধা প্রদান করে।
বেলুচিস্তানের বিক্ষোভ রুখতে বহু বছরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখনই উপযুক্ত সময় রাষ্ট্রকে দেখতে হবে কেন তারা সম্পদ সমৃদ্ধ অথচ ভয়ংকর দরিদ্র এই প্রদেশে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।
