‘মা’ শব্দটা অভিধানের আর পাঁচটা শব্দের মতো নয়। এর সঙ্গে বিপুল আবেগ জড়িত—ভালোবাসা, ধৈর্য, বিশ্বাস এবং আরও অনেক কিছু। বিশ্ব জুড়ে, দেশ বা অঞ্চলভেদ ব্যতিরেকে সন্তানরা মায়ের সঙ্গে স্নেহের সম্পর্কে যুক্ত। মা শুধু সন্তানের জন্মই দেন না, তাদের মন, ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দেন। আমি নিঃসন্দেহ যে আমার জীবনে যা কিছু ভালো, সবই আমার বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। সুদূর দিল্লিতে বসেও আমার অতীতের স্মৃতি মনে পড়ছে।
মায়ের নিঃস্বার্থতাই ভালো মানুষ তৈরি করে। তার স্নেহ, সন্তানের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও সমমর্মিতা তৈরি করে। মা শুধু একজন ব্যক্তি মানুষই নন, মাতৃত্ব একটি গুণ। আমরা প্রায়ই বলি, ভগবান তার ভক্তদের চরিত্রানুযায়ী গঠিত। একইভাবে আমাদের নিজেদের মানসিকতা ও স্বভাবের প্রতিফলন আমরা দেখি মায়ের মধ্যে।
আমার মায়ের জন্ম গুজরাটের মেহসানা জেলার ভিসনগরে। মা কিন্তু তার মায়ের স্নেহ পাননি। মা-র খুব ছোট বয়সেই স্প্যানিশ ফ্লু অতিমারিতে আমার দিদিমা মারা যান। মা-র ছোটবেলা কেটেছে মাতৃহীন হয়ে। মা স্কুলেও যাননি বা লিখতে-পড়তেও জানেন না। মায়ের শৈশবে ছিল শুধুই দারিদ্র্য আর বঞ্চনা।
ভাদনগরে আমাদের পরিবার একটা ছোট্ট জানালাহীন বাড়িতে থাকত। শৌচাগারের তো প্রশ্নই নেই। মাটির দেওয়াল আর টালির ছাদের এই ছোট্ট ঘরটিকেই আমরা আমাদের বাড়ি বলতাম। আমি, আমার ভাইবোনেরা, বাবা-মা সবাই ঐ বাড়িতে থাকতাম। বাঁশ আর কাঠের পাটাতন দিয়ে বাবা একটা মাচান বানিয়েছিলেন, যাতে মায়ের রান্না করতে সুবিধা হয়। ওটাই ছিল আমাদের রান্নাঘর। মা মাচানের ওপর উঠে রান্না করতেন আর আমরা ওখানে বসে খেতাম। সাধারণত, দারিদ্র্য ক্লান্ত করে। কিন্তু আমার বাবা-মা দৈনিক সংগ্রামের উদ্বেগের মধ্যেও পরিবারের শান্তি বিঘ্নিত করতে দেননি। বাবা-মা নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছিলেন আর তা পালন করতেন।
ঘড়ির কাঁটা ধরে বাবা ভোর ৪টায় কাজে বেরিয়ে যেতেন। বাবার পায়ের শব্দে প্রতিবেশীরা বুঝতে পারতেন ভোর ৪টা বাজে আর ‘দামোদর কাকা’ কাজে যাচ্ছেন। বাবার আর একটা কাজ ছিল চায়ের দোকান খোলার আগে স্থানীয় মন্দিরে পুজো করা।
মা-ও ছিলেন একই রকমের সময়ানুবর্তী। বাবার সঙ্গে একই সঙ্গে ঘুম থেকে ওঠে সকালের মধ্যেই সংসারের সব কাজ সেরে ফেলতেন। মা কখনো চাইতেন না আমরা পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের কাজে মাকে সাহায্য করি। কোনো দিন আমাদের কাছে সাহায্য চানওনি। কিন্তু মাকে অত কষ্ট করতে দেখে আমরা নিজেরাই বুঝতে পেরেছিলাম যে, মাকে সাহায্য করা দরকার। সংসারের খরচ চালাতে মা দু-একটি বাড়িতে বাসন মাজার কাজ করতেন। অনেক সময় চরকাও কাটতেন। তুলো ছেঁড়া থেকে সুতো কাটা, সবটাই একা হাতে করতেন।
নিজের কাজের জন্য অন্যদের ওপর মা নির্ভর করতেন না। আমাদের মাটির বাড়িতে বর্ষাকালে নানান সমস্যা হতো। বর্ষার সময় ছাদের ফুটো দিয়ে জল পড়ে ঘর ভেসে যেত। বালতি, বাসন বসিয়ে মা বর্ষার জল ধরে রাখতেন। ঐ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মা কিন্তু শান্ত থাকতেন। অবাক হবেন এটা জেনে যে, মা ঐ জলটা পরবর্তী কয়েক দিন নানা কাজে ব্যবহার করতেন।
বাড়ি সাজাতে মা ভালোবাসতেন আর পরিষ্কার করে সাজিয়েগুছিয়ে রাখার জন্য অনেক সময়ও ব্যয় করতেন। গোবর দিয়ে মেঝে নিকিয়ে রাখতেন। ঘুঁটে জ্বালালে ভীষণ ধোঁয়া হতো আর মা আমাদের ঐ জানালাহীন বাড়িতে বসে রান্না করতেন।
মায়ের আর একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল, পুরোনো কাগজ জলে ভিজিয়ে রেখে, তার সঙ্গে তেঁতুল বিচি মিশিয়ে আঠার মতো একটা জিনিস তৈরি করতেন। দেওয়ালে এই আঠা লেপে তার ওপরে আয়নার টুকরো আটকে অসাধারণ ছবি বানাতেন মা। দরজায় স্থানীয় বাজার থেকে কেনা ঘর সাজানোর জিনিস ঝুলিয়ে রাখতেন।
বিছানা ঠিকভাবে পরিষ্কার করে টানটান করে পাতা হয়েছে, মা এ বিষয়ে খুব সচেতন ছিলেন। খাটের ওপর একফোঁটা ধুলো থাকতে পারবে না। চাদর একটুও কুঁচকে যাওয়া মানেই, আবার বিছানা ঝেড়ে পাততে হবে।
পরিচ্ছন্নতা নিয়ে মায়ের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে আমি পাতার পর পাতা লিখতে পারি। যারা পরিচ্ছন্নতা ও স্বচ্ছতার কাজে জড়িত, তাদের প্রতি মায়ের গভীর শ্রদ্ধা ছিল। ভাদনগরে আমাদের বাড়ির পাশের নর্দমা পরিষ্কার করতে যখনই কেউ আসতেন, মা তাদের চা খাওয়াতেন।
অন্য পশু-পাখির প্রতি মায়ের স্নেহ-ও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। বাবার চায়ের দোকানের দুধের সর দিয়ে মা ঘি বানাতেন। এই ঘি শুধু আমরাই খেতাম না, প্রতিবেশী গরিবরাও তার ভাগ পেত। এই গরিবরা প্রতিদিন সকালে মায়ের কাছ থেকে রুটি পেত।
আমাদের বাড়ি খুব ছোট্ট ছিল ঠিকই; কিন্তু মায়ের হৃদয় ছিল বিশাল। কাছাকাছি গ্রামে বাবার এক বন্ধু থাকতেন। অকালে তার মৃত্যুর পর, তার ছেলে আব্বাসকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন বাবা। আমাদের বাড়ি থেকেই আব্বাস তার পড়াশোনা শেষ করেছিল। আমাদের ভাইবোনদের প্রতি মা যতটা যত্নবান ছিলেন, আব্বাসের প্রতিও ততটাই। প্রতি বছর ঈদে মা ওর পছন্দের খাবার বানাতেন।
আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে মা আমার সঙ্গে যাননি। অতীতেও মাত্র দুই বারই মা আমার সঙ্গে গিয়েছিলেন। একবার আমেদাবাদে, শ্রীনগরে লালচকে একতা যাত্রা সম্পন্ন করার পর জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে আমি ফিরে আসার পর মা আমার কপালে তিলক এঁকে দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো, যখন আমি ২০০১ সালে প্রথম বার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলাম। দুই দশক আগের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটিই হলো আমার সঙ্গে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে মায়ের শেষবার অংশগ্রহণ। সেই থেকে কোনো সরকারি অনুষ্ঠানেই মায়ের সঙ্গলাভের সৌভাগ্য আমার হয়নি।
আরেকটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। আমি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আমার সব শিক্ষকদের প্রকাশ্যে সংবর্ধনা জানাতে চেয়েছিলাম। আমি ভাবতাম যে, মা হলেন জীবনে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষক, আর তাই তাকেও আমার সম্মান জানানো উচিত। এমনকি, আমাদের শাস্ত্রেও বলে যে, মায়ের থেকে বড় গুরু কারোরই আর হয় না ‘নাস্তিমাত্রোসমগুরু ‘আমি মা’কে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করা সত্ত্বেও মা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘দেখ, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি হয়তো তোমাকে জন্ম দিয়েছি; কিন্তু তুমি ঈশ্বরের দ্বারাই শিক্ষালাভ করে বড় হয়ে উঠেছ।’ সেই দিন মা ছাড়া আমার সব শিক্ষকই সংবর্ধিত হয়েছিলেন। এছাড়া, ঐ অনুষ্ঠানের আগে মা জানতে চেয়েছিলেন, আমাদের স্থানীয় শিক্ষক, জেঠাভাই যোশিজির পরিবার থেকে কেউ ঐ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন কি না। যোশিজি আমার শিক্ষারম্ভের পর্বে আমার শিক্ষক ছিলেন এবং আমার বর্ণপরিচয়ও হয় তার হাতেই। মা তাকে মনে রেখেছিলেন এবং জানতেন যে, তার জীবনাবসান হয়েছে। যদিও মা সেই অনুষ্ঠানে যাননি; কিন্তু তিনি খেয়াল রেখেছিলেন, যাতে আমি জেঠাভাই যোশিজির পরিবারের কাউকে অবশ্যই আমন্ত্রণ জানাই।
মাকে কোনো কিছু নিয়েই কখনো কোনো অভিযোগ করতে শুনিনি। কারো সম্পর্কেও কোনো অভিযোগ তার নেই বা তিনি কারো থেকে কিছু প্রত্যাশাও করেন না। আজ পর্যন্ত মায়ের নামে কোনো সম্পত্তি কিছু নেই।
ঈশ্বরের প্রতি মায়ের অসীম বিশ্বাস। কিন্তু, একই সঙ্গে তিনি কুসংস্কার থেকে দূরে থেকেছেন এবং আমাদের মধ্যেও সেই একই গুণাবলির সঞ্চার করেছেন। পরম্পরাগতভাবে তিনি কবিরপন্থি আর তার দৈনন্দিন প্রার্থনায় তিনি সেই প্রথা আজও মেনে চলেন।
আমি যখন বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই, আমি তাকে জানানোর আগেই মা সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। আমি প্রায়ই বাবা-মাকে বলতাম, আমি বাইরে বেরিয়ে পড়তে চাই আর দুনিয়াটাকে বুঝতে চাই। আমি তাদের স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে বলতাম আর এও বলতাম যে, আমি রামকৃষ্ণ মিশন মঠে যেতে চাই। এটা অনেকদিন ধরে চলেছিল। অবশেষে আমি গৃহত্যাগের সিদ্ধান্ত জানাই এবং তাদের আশীর্বাদ প্রার্থনা করি। আমার বাবা একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন এবং বিরক্তি সহকারে বলেছিলেন, ‘তোমার যা অভিরুচি’। আমি তাদের জানাই, তাদের আশীর্বাদ ছাড়া আমি ঘর ছাড়ব না। মা আমার অভিপ্রায় বুঝে আশীর্বাদ করে বলেন, তোমার মন যা চায়, তাই করো।’ এর কয়েক ঘণ্টা পর আমি গৃহত্যাগ করি। মা আমাকে সব সময়েই গরিব কল্যাণে নজর দিতে এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণে উত্সাহিত করেছেন। আমার মনে আছে, যখন আমি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হব বলে স্থির হলো, সেই সময় আমি রাজ্যে ছিলাম না। ফিরে আসার পর আমি সোজা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তিনি আমাকে বলেন, ‘সরকারে তোমার কী কাজ আমি বুঝি না, কিন্তু তুমি যেন কখনো উৎকোচ না নাও, আমি সেটাই চাই।’
মা আমাকে সব সময় এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, তার সম্পর্কে দুশ্চিন্তা করে বৃহত্তর দায়িত্ব সম্পর্কে মনোযোগ খোয়ানো উচিত হবে না। যখনই আমি মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলি, ‘কারো সঙ্গেই কোনো অন্যায় বা মন্দ কিছু কোরো না আর গরিবদের জন্য কাজ করতে থাকো।’ আমি যদি আমার বাবা-মায়ের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখি, সততা ও আত্মসম্মান হলো তাদের সবচেয়ে বড় গুণ। দারিদ্র্য ও তার সঙ্গী নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই সত্ত্বেও আমার পিতামাতা কখনো সততার পথ ত্যাগ করেননি বা আত্মসম্মানের সঙ্গে আপস করেননি।
এখন যখনই মায়ের সঙ্গে দেখা হয়, মা আমাকে সব সময়েই বলেন, ‘আমি কারো সেবা নিতে চাই না, আমার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সচল থাকা অবস্থাতেই আমি চলে যেতে চাই।’ আমার মায়ের জীবনকাহিনীতে আমি সংযম, আত্মত্যাগ ও ভারতের মাতৃশক্তির প্রতি অবদান দেখতে পাই। যখনই আমি মায়ের দিকে ও তার মতো কোটি কোটি নারীর দিকে দেখি, তখনই মনে হয় যে, এমন কিছু নেই, যা ভারতীয় নারীর পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।
আমি তোমার চরণে প্রণাম জানাই।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মা গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। ২০২২ সালের ১৮ জুন মায়ের শততম জন্মদিনে নিজের ব্লগে লিখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে আমাদের প্রকাশ।

