বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গল্প

‘অবণিতা’

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৩, ২৩:৩৯

শুক্রবার সকালবেলা। এক হাতে একজোড়া জুতো অন্য হাতে দশাধিক শুকনো কাপড়চোপড় নিয়ে শহরে ঢুকছিলাম। এমন সময় বন্ধু সেফায়েত ফকিরের ফোন।

—বন্ধু, কেমন আছ?

—কেমন আর আছি। ছোটবেলা থেকে বিরক্ত করার সময়টা আর তুই ভুলতে পারলি না।

—ঘরে তো তোর বউ নাই। তোর আবার বিশেষ সময় কীসের?

—এক হাতে জুতো আর অন্য হাতে একগাদা কাপড়চোপড় নিয়ে লন্ড্রিতে যাবার সময় ফোন করলে ফোন কত কষ্ট করে ধরতে হয়, বুঝিস? তুই এক কাজ কর, সাতক্ষীরা ডেয়ারিতে একটু অপেক্ষা কর। আমি আসছি।

—মানে? তুই সাতক্ষীরায়। ঢাকা থেকে ফিরলি কখন?

—এই তো গাড়ি থেকে পুরোপুরি এখনো নামতে পারিনি। তুই পাঁচ মিনিট অপেক্ষা কর। আমি আসছি।

সাতক্ষীরার ঘোষ ডেয়ারিতে ঢুকতেই দেখি সাড়ে পাঁচ ফিটের ওপরে লম্বা সুশ্রী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে টপকে ভিতরে প্রবেশ করে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। বসতে না বসতেই ডেয়ারির একটা ছেলে আমাকে এক প্লেট দই দিয়ে গেল। এই ডেয়ারিতে মাসে অন্তত দুই-একবার আসি। ওদের বলতে হয় না, আমাকে দেখলেই ওরা এক প্লেট দই টেবিলে দিয়ে যায়।

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে—নিজের সইলেও প্রতিবেশীর সয় না। আমি নির্লিপ্তভাবে দই খাচ্ছি দেখে সুন্দরী মেয়েটি আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল। সুন্দরী মেয়েটা একটুখানি তাকিয়েছে, সেটাই অনেক। সে নিশ্চয়ই তার সৌন্দর্যের ভার জানে। মনে মনে মেয়েটির নামকরণ করলাম। নাম দিলাম অবনিতা।

অবনিতা ছয় কেজি মিষ্টি কিনেছে। অবনিতার বাবা-মাও ধারেকাছে আছেন। তাঁরা বাজার করতে গিয়েছেন বলে, ছয় কেজি মিষ্টির বড় বোঝার মতোই অবনিতাকে মিষ্টির দোকানে রেখে গেছেন। কিছুক্ষণ পর বাজার শেষ করে অবনিতার বাবা-মা এলেন। অদ্ভুতভাবে অবনিতার মা আমাকে প্রাথমিকভাবে দেখেই যেন আশ্চর্য হয়ে গেলেন। অবশ্য মুখে কিছুই বললেন না। অবনিতা মাকে পেয়ে রেগেমেগে আগুন—বাজারে এতসময় কী করেছ?

—কতকিছু কিনলাম। সময় তো একটু লাগবেই।

তারা একটা গাড়ি রিজার্ভ করে ব্যাগ, মিষ্টি, আনাজপাতি নিয়ে গাড়িতে উঠল।

অবনিতার চলে যাবার সময় আমি শেষবারের মতো অপরূপ রূপের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার আর কী দোষ। কাজী নজরুল ইসলামও তো বলে গেছেন—‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ।’ আমি কবি হলে অবনিতাকে দেখে নিশ্চয়ই লিখে ফেলতাম—

‘হাত বাড়িয়ে দিয়েছি প্রিয়, তুমি মন বাড়িয়ে ছুঁইও।

অবনিতাই নও শুধু তুমি, তুমি টগর, চামেলি, জুঁইও।’

বন্ধু সেফায়েত ফকির চলে আসে এরই মধ্যে। ওকে মিষ্টি খাওয়ালাম। গল্প করলাম। হাতে বহু কাজ। সেফায়েত তাড়া দিল। আমি চুল-দাড়ি কেটে জামাকাপড় ইস্ত্রি সেরে জুতায় কালি করে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন বেলা একটা।

ছোটখাটো যাই হোক একটা চাকরি করি। সেখানে বাড়তি ছুটি নাই বললেই চলে। শুক্র-শনি দুদিন যদিও আমার ছুটি। ঢাকা ভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের কোনো এক ছাত্রীর বাড়িতে যেতে হবে তাদের সাতক্ষীরার বাসায়। বিকেলের কন্যাসুন্দরী আলো ফোটার আগে আগেই যেতে হবে, বিদ্যুতের আলোয় নাকি মেয়েদের সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। ঘটক সেরকমই বলে রেখেছে। আর সেজন্যই আমার এত তাড়া।

বিকেল পাঁচটা। মেয়ের বাবা বাড়ির ভেতরেই আছেন। মেয়ের মায়ের ছোট ছোট কথা শোনা যাচ্ছে ঘরের ভেতর থেকে। এদিকে কর্তৃপক্ষ মেয়ের ছোট বোনকে নিযুক্ত করলেন আমাদের অভ্যর্থনা কক্ষে। দেখাতে কোনোক্রমে রাত করবে না বলেই, সে আমাদের খাবার পরিবেশন করে মেয়েকে নিয়ে এলো আমাদের সম্মুখে। অবনিতা!

অবনত মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। তারপর মিষ্টি হেসে আমাকে প্রশ্ন করল, কেমন আছেন? আমাকে চিনেছেন?

—আপনাকে না চেনার দুঃসাহসী বিস্মৃতি কি হওয়া সম্ভব?

—আপনাকে বিচলিত মনে হচ্ছে।

—না না। আমি মোটেই বিচলিত নই।

—আচ্ছা! সকালবেলা আমার কী নাম রাখলেন?

—তোমার নাম?

—হ্যাঁ। আমার নাম। রাখেননি একটা?

আমি অল্পখানিকটা তোতলালাম—আমি আপনার নাম রেখেছি, জানলেন কেমন করে?

মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা আমার। কতদূর কী শিখতে পেরেছি তা একটু ঝালাই করে দেখলাম। কোনো প্রশ্ন করবেন?

—হ্যাঁ, না।

আমি আমতা আমতা করছি দেখে অবনিতা হাসল।

—কেমন লেগেছে আমায়?

—মিষ্টি খাব।

অবনিতা একটা মিষ্টির সর প্লেটে ঢেলে দিল।

মিষ্টির দিকে তাকাতে তাকাতে বললাম, আমাকে আপনার ভালো লাগেনি?

অবনিতা হাসল। বলল, আচ্ছা, একটা মিষ্টি দুজনে খেলে আপনার কি কোনো আপত্তি আছে?

—কিন্তু মিষ্টি তো ছয় কেজি!

—আপনি দুষ্টু একটা। বাবা-মা আসছেন। আপনারা কথা বলুন। আমি আসছি।

অপূর্ব স্মিত হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে অন্দরমহলে মিলিয়ে গেল অবনিতা।

ইত্তেফাক/এসকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন