জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ ১০ জানুয়ারি। পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের এই দিন তিনি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের পাতায় খবর ছাপা হয়। সেখানে লেখা হয়, বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভ’। এছাড়া ‘যে কোন মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পৌঁছিতেছেন’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর তার মুক্তি ও দেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে সারা দেশেই উৎকণ্ঠা বিরাজ করছিল। তার দেশে ফিরে না আসা পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আনন্দ অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরার মধ্য দিয়ে মানুষ যেন পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের দেখা পেয়েছিল সেদিন। বঙ্গবন্ধু তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে।
সেই বৃষ্টিস্নাত বিকালে, বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি যখন তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করে, তখন ঢাকার রাস্তায় আনন্দ-অশ্রুতে উদ্বেলিত হতে থাকে লাখ লাখ জনতা। তাকে একনজর দেখে বুকে সাহস ফিরে পায় জাতি। ফিরে এসেছেন জাতির পিতা।
বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। একদিকে বিজয়ের আনন্দ, অন্যদিকে স্বজন হারানোর বেদনায় কাঁদছিলেন বঙ্গবন্ধু্। আরেক দিকে, বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদে বুক ভাসিয়েছেন। এর আগে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগের পর মুক্তি লাভ করেন তিনি। সেদিনই তিনি পাকিস্তান থেকে লন্ডন যান। সেখানে দুদিন অবস্থান করে ১০ জানুয়ারি দিল্লি হয়ে ঢাকা ফেরেন বঙ্গবন্ধু।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নিয়ে আটক রাখা হয়। সেখানে প্রহসনের বিচারে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সব বাধা কাটিয়ে তিনি ফিরে আসেন বাংলার মানুষের মধ্যে।
জাতির পিতা পাকিস্তান কারাগার থেকে ছাড়া পান ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারির ভোরবেলা। এদিন বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল হোসেনকে একই বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৬টায় তারা পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে। পরে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে দেখা করেন বঙ্গবন্ধু। পরদিন রাতে ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে ৯ জানুয়ারি রাতে দেশের পথে যাত্রা করেন বঙ্গবন্ধু। ১০ তারিখ সকালেই তিনি নামেন দিল্লিতে। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, প্রধান নেতৃবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্যান্য অতিথি এবং সে দেশের জনগণের কাছ থেকে উষ্ণ সংবর্ধনা লাভ করেন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান।
১০ জানুয়ারি বেলা ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ঢাকা পৌঁছান। প্রিয় নেতাকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান।
বিকাল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারব কি না। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি, বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’
তিনি বলেছিলেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এ দেশের যুবক যারা আছে, তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই, তোমরা গেরিলা হয়েছ, তোমরা রক্ত দিয়েছ, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।’
ভাষণে বঙ্গবন্ধু আরও বলেছিলেন, ‘যারা দালালি করেছে, যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করেছে তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, এক জনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই, স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে।’
