এতো দেখি বিশাল উন্নতি। সব গাঁজাখোর, হেরোইনখোর, ইয়াবাখোর গায়েব এলাকা থেকে। এসবের সাপ্লাইয়ারগুলোরও কোনো খবর নাই। একদম লাপাত্তা। কয়েক দিন যাবত আরামে ঘুমাতে পারছি, কোনো টেনশন নাই। রাস্তায় ছিনতাইয়ের ভয় নাই। রাতে চোরের উপদ্রব নাই। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার কেউ নাই। কী যে ভালো লাগছে! আমার এলাকার পঞ্চান্ন পেরুনো শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সামছুল হক এভাবেই মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ-র্যাবের অভিযানের ব্যাপারে মন্তব্য করছিলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে স্বগতোক্তি করলেন, ‘এ রকম একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ব্যাপার কি হতে পারে না খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে? সরকার যদি কঠোর হতে পারে মাদকের বিরুদ্ধে, তাহলে কেন পারবে না বজ্রকঠিন হতে স্বাস্থ্য-বিধ্বংসী ভেজালের বিরুদ্ধে? অবশ্যই পারবে। শেখ হাসিনার সরকার চাইলে সবই পারে। পত্রিকায় লিখুন না এ বিষয়ে। হয়ত জনগণ জেগে ওঠবে।’
আমি নিজেও এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। একবার ভেজাল খাদ্যে ফুড পয়জনিংয়ের কারণে সেই ছিয়ানব্বই সালে আমাকেও যেতে হয়েছিল হাসপাতালে অচেতন অবস্থায়। ভেজালের কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ে চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো অনেক বিষয়। আমরা তো আক্রান্ত হয়ে আছি অনেক কিছুতে। দেশে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৫ কোটি মানুষ। গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় গড়ে ১৫ জন মায়ের মৃত্যু হয় প্রতিদিন। রাস্তায় গাড়ির নৈরাজ্যে প্রাণ হারায় অগণিত মানুষ। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ যাচ্ছে অনেকের। অগ্নিকাণ্ড, পীর-ওঝার ‘ডান্ডা মেরে রোগ ঠান্ডা’ করার মতো অপচিকিত্সা আর নির্যাতন-নিপীড়নে মারা যায় বহু লোক। মাদকের ছোবলে মরে অজানাসংখ্যক মানুষ। জীবিত মানুষের জন্য ওঁত্ পেতে থাকে মৃত্যুর দূত নানা বেশে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ভেজাল খাদ্য। বহুরূপী ভেজাল নানা বেশে এসে হানা দেয় জনগণের প্রাণ-কুটিরে। ভেজাল দিচ্ছে ভেজালীরা প্রায় সব কিছুতে। চাল, ডাল, আটা, মসলা, মাছ, মাংস, দুধ, পানি, ওষুধ, ফলফলারি - কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা লিখব! ভেজালের আছে বহু রূপ, বহুকিছুতে। চালের ভেজাল কঙ্কর। ভালো চালে মিশ্রিত হচ্ছে নষ্ট-পচা অখাদ্য চাল। আটার ভেজাল ভূষি। মাছে ফরমালিন; কলা-আনারস-আম-লিচুসহ সব রকম ফলমূলে কারবাইড আর সালফারসহ ক্ষতিকর রং; গরু-খাসির মাংসে বিষাক্ত কেমিক্যাল; ফ্রিজে রাখা বাসি আর শুকিয়ে যাওয়া গরু-খাসির মাংসে রক্তবর্ণের বিষাক্ত রাসায়নিক রং (১৯টি টেক্সটাইলের রং খাদ্যে ব্যবহার হচ্ছে যা ক্যান্সার-কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে); সবজিতে কীটনাশকের বিষ আর তাজা রাখতে কেমিক্যাল; দুধে দূষিত পানি আর যতসব আটাগোলানো ঘন দ্রবণ; মালাই চা-তে সাদা টিস্যু পেপার; চানাচুরে ক্যান্সার সৃষ্টির সহায়ক অ্যাক্রিলামাইড; ‘মিনারেল ওয়াটার’ নামক পানির বোতলে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-কর্ণফুলীর দূষিত ব্যাকটেরিয়াপূর্ণ পানি; মসলায় ইটের গুঁড়া; সরিষার তেলে সাইট্রিক এসিড আর সয়াবিন তেলে পামঅয়েল। পোড়া মবিল দিয়ে তৈরি ‘মজাদার’ শিঙাড়া আর সমুসা-ডালপুরি-পেঁয়াজু-বেগুনি। বিদেশের নষ্ট দুধ বাংলাদেশে এলেই হয়ে যায় ‘তাজা’ দুধ। প্যাকেট মসলায় সব গুঁড়াই কি খাবারযোগ্য গুঁড়া? প্যাকেটজাত দুধে সিসা, ময়দা আর অ্যান্টিবায়োটিক আর খাবার তেলের মধ্যে যে কত রকমের তেলেসমাতি তা বোধহয় জনগণ বেশ ভালো করেই বুঝেছে মিডিয়ার কল্যাণে। সয়াবিনে কত কিছিমের ‘ছোঁয়া’ যে আছে তা একমাত্র ভেজাল তেলের কারবারিরাই বলতে পারবে সঠিকভাবে। মানুষের ‘জীবন’ হিসেবে পরিচিত পানি নিয়ে কত যে কাহিনি। সুপেয় পানির অভাব সব শহরে। ফুটিয়ে পান করার কারণে দৈনিক কয়েক কোটি টাকার গ্যাস-জ্বালানি পোড়ানো হয়। দূষিত পানি পান করে মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত নাগরিক জীবনে বেঁচে থাকার লড়াই আর কতকাল চলতে থাকবে? আক্রান্তরা হারিয়ে ফেলছে জীবনীশক্তি, অসহায় মানুষ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে কবর-শ্মশানের দিকে।
বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ‘ব্র্যান্ড’ খাদ্যের ওপর মানুষের কতো বড় আস্থা ছিল। যারা ব্র্যান্ড-সুনাম তৈরি করেছিল তারা নিজেরাই সেটি নষ্ট করে দিয়েছে শুধু অতিলোভের মরণকামড়ে দিশাহারা হয়ে। অতি সম্প্রতি ৫২টি ব্র্যান্ডপণ্য নিম্নমানের কারণে মহামান্য হাইকোর্ট বাজার থেকে তুলে নেবার আদেশ দিয়েছেন যা যথার্থ এবং অপরিহার্য। জাতীয় মান-নির্ধারণকারী সংস্থা (বিএসটিআই) ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষা করে ২২টি পণ্যকে নিম্নমানের ঘোষণা করে ১১ জুন বাজার থেকে তুলে নিতে উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন নামকরা প্রতিষ্ঠানের লাচ্ছা সেমাই, সরিষার তেল, ধনিয়া গুঁড়া, জিরা গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া, বাটার অয়েল, লবণ, আর ঘি।
গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত খবর থেকে সহজেই অনুমেয়, বাংলাদেশ হয়ে ওঠেছে ভেজালের স্বর্গরাজ্য। ভরে গেছে সারাদেশ খাদ্যদস্যুতে। এসব খাদ্যদস্যু আবার সমাজে বহুরূপী। কেউ সমাজসেবক, কেউ দানবীর, কেউ হাজি কিংবা মহাগুরু, কেউ বা সুশীল সমাজের মাথা, গ্রাম-মহল্লার সর্দার-মাতব্বর, আবার কেউ কেউ জনদরদী নেতা ও স্বঘোষিত ‘ফুলের মতো চরিত্র’ এবং পোশাকে-আশাকে সাধু সাধু ভাব। অনেকে এমন ভাব ধরেন যা দেখলে মনে হয়, আহারে কী সজ্জন মানুষ, একেবারে যেন পীর-মাশায়েখ। এসব বহুরূপী নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে আমাদের ভবিষ্যত্। এরাই উন্নয়নের বিষফোড়া। সমূলে কেটে ফেলা ছাড়া বিষফোড়ার আর কোনো চিকিত্সা নাই।
ভেজাল ছাড়াও অনেক খাদ্যসামগ্রী বিক্রেতাদের অবহেলা আর অনবধানতার কারণে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। এ বিষয়টিও ভোক্তাদের ভাবিয়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, গবেষণায় দেখা গেছে, পাস্তুরিত দুধের তিন-চতুর্থাংশই অনিরাপদ। এমনভাবে বিপণনের বিভিন্ন স্তরে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে যা খেলে শারীরিক অসুস্থতা অবশ্যম্ভাবী। জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ কলিফর্ম আর ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত দুধ পাওয়া যাচ্ছে অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত দুধে। পাস্তুরিত দুধকে উত্পাদন পর্যায় থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত সকল স্তরে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল করার প্রয়োজন থাকলেও তা মানা হয় না। পুষ্টিজগতের সর্বত্রই ভেজাল। যাবে কোথায় জনগণ? পুষ্টিকর জাতি তৈরি করতে হলে নির্ভেজাল পুষ্টিকর খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতেই হবে। এটি সরকারের দায়িত্ব।
‘অরিজিনাল ভেজাল’ ছাড়াও রয়েছে ‘ছদ্মবেশী ভেজাল’। শহরে-বন্দরে গ্রামেগঞ্জে সর্বত্র। এগুলো হচ্ছে নিম্নমানের পণ্য, অতিমূল্য, ওজনে কারচুপি, বাতাসভরা চিপসের প্যাকেটের মতো ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো পণ্যের প্যাকেজ (আছে এক কেজি, দেখতে মনে হবে দুই কেজি); রেস্টুরেন্টে মুরগির ঠ্যাং আর বুকের গায়ের মাংস খুলে নিয়ে বেসন দিয়ে মোটা করে দেখানো ‘রোস্ট’, বাসি খাবার পরিবেশন, রান্নাঘরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া উন্মুক্ত পয়ঃনালায় জমে থাকা দুর্গন্ধময় আবর্জনার পাশে তৈরি খাবার (অভিজাত এলাকার নামকরা রেস্টুরেন্টে); নর্দমার ধারে বসে বানানো মিষ্টি; নোংরা ঘরে ঘামে সিক্ত কর্মীর দুহাত বেয়ে ঝরা ঘামমিশ্রিত আইসক্রিম কিংবা পাউরুটি-বিস্কুট; মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য আর নকল ঔষধ; নিম্নমানের চর্বি জাতীয় তেল দিয়ে তৈরি চানাচুরসহ সমজাতীয় খাবার; ট্যানারির বর্জ্যে তৈরি মাছ-মুরগির খাবার যার পুরোটাই বিষের সমতুল্য; গ্রাহক ঠকানোর মতলবে যার যার খুশিমতো মূল্য নির্ধারণ; চিকিত্সক কর্তৃক রোগীদের জন্য অযথা টেস্টের মহামারি; বিনা কারণে এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের জন্য প্রদত্ত প্রেসক্রিপশন। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এপ্রিলের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভোগ্যপণ্যের মধ্যে শতভাগ ভেজাল আটটিতে, মিষ্টিতে ৯৩.৮৩ ভাগ, জুস-ফ্রুটসিরাপ-সরবতে ৬৬ ভাগ আর শিশুখাদ্য জ্যাম-জেলি থেকে শুরু করে সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের মধ্যে গড় ভেজালের হার ৫১.০৩ ভাগ।
ভেজাল, নকল আর মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ঠেকানোর জন্য রয়েছে একাধিক আইন আর বেশ কয়েকটি সরকারি সংস্থা। তারা তাদের কর্তব্য কতটুকু পালন করছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিদের মধ্যকার ‘ভেজাল’ সারাতে হবে সর্বাগ্রে। তাদের মধ্যে যদি ভেজাল না-ই থাকতো, তাহলে খাদ্যের ভেজাল দূর হয় না কেন? ভেজাল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যেসব কর্মকর্তাদের তাদেরকে তো চার দেয়ালের অফিসের বাইরে আসতে হবে, ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে থেকে তারা করেনটা কি? তাদেরকে প্রত্যেক দিনের কাজকর্মের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা খুবই জরুরি।
একইসঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে। ভেজালকারীরা শুধু বিকৃত চিন্তার মানুষই নয়, তারা সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী; তারা মানুষকে তিলে তিলে হত্যা করছে সবার অগোচরে। আসুন সবাই মিলে ভেজালের বিরুদ্ধে, ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে বয়কটসহ তাদের পণ্য কেনা বন্ধ করে দেই। রুখে দাঁড়াই এদের নীতিবিবর্জিত অসত্ কাজের বিরুদ্ধে, প্রতিরোধ করি তাদেরকে গ্রামেগঞ্জে, হাটে-বাজারে, অলিতে-গলিতে, শহরে-বন্দরে সর্বত্র। মাদক-ব্যবসায়ীদের মতো ভেজালকারীদেরকেও নির্মূল করার সংকল্প নিয়ে সরকারও মাঠে নামুক সর্বশক্তি নিয়ে। আমরা জনগণ হবো সরকারের সঙ্গী।
বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরসূরি তাঁর সফল রাষ্ট্রনায়ক কন্যার ওপর আস্থা আছে জনগণের। তাই তাঁর নেতৃত্বে হোক শুরু আরেকটা যুদ্ধ ভেজালের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে তিনি যেসব ব্যবস্থা নিয়েছেন তা দেশবাসীর অকুণ্ঠ প্রশংসা কুড়িয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, বিষযুক্ত খাদ্য-পরিবেশ নির্মূল করা হবে, বছরে প্রায় ৪৫ লাখ খাদ্য বিষে আক্রান্ত মানুষ রক্ষা পাবে, প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার।
n লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
