রাজধানী ঢাকার অলি-গলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কে যত্রতত্র বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়। দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন বেড়েছে। অথচ নতুন এলাকাগুলোয় এখনো শুরু হয়নি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। বর্জ্যের অব্যবস্থাপনার কারণে একদিকে যেমন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি, অন্যদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার কারণে অকেজো হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা, সময়মতো বর্জ্য পরিবহন না করা এবং মানুষের অসচেতনতার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সফলতা আসছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছেন, আগের চেয়ে বেশি পরিমাণ বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা হচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গাড়ি, লোকবল এবং বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে (ল্যান্ডফিল) জায়গা বাড়ানো হয়েছে। দুই সিটির পক্ষ থেকে রাজধানীর ফুটপাতে প্রায় সাত হাজার ছোট ওয়েস্ট বিন স্থাপন করা হয়েছিল। এর বেশির ভাগই চুরি ও অকেজো হয়ে গেছে। ওয়েস্ট বিনেও নগরবাসীর ময়লা ফেলতে আগ্রহ কম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা শহরে সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ঢাকায় মূলত গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক, রাস্তাঘাটের বর্জ্য, কারখানা ও নির্মাণকাজ বা ঘরবাড়ি ভাঙার বর্জ্যই বেশি। উন্নত দেশে স্থানীয়ভাবে জৈব-অজৈব বর্জ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। অথচ বাংলাদেশে যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। রাজধানীতে এক কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। জনপ্রতি ৫৬০ গ্রাম বর্জ্য হয়। দুই সিটি এলাকায় প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। যার ৮০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারে সিটি করপোরেশন। বাকি ২০ শতাংশ বর্জ্য কোনো না কোনোভাবে বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকে। এসব বর্জ্য বাতাসের সঙ্গে মিশে পরিবেশের দূষণ ঘটায়।
দক্ষিণ সিটি (ডিএসসিসি) বলছে, প্রতিদিন ২৫০০ থেকে ৩০০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে ল্যান্ডফিলে ফেলা হয়। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো যুক্ত হয়নি সংস্থাটির নতুন এলাকা। তবে সংস্থাটির নিজস্ব ‘ল্যান্ডফিল’ মাতুয়াইলে আরো ৯০ একর জায়গা নেওয়া হয়েছে। যেখানে আরো সাত বছর বর্জ্য ফেলা যাবে। তবে এর আগেই বর্জ্যকে ব্যবহার করে শক্তিতে রূপান্তরিত করার চিন্তা করছে সংস্থাটি।
ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য পরিবহনের জন্য ১০টি নতুন গাড়ি পেয়েছি। নতুন ওয়ার্ডগুলোয় এ বছরের মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুরু করতে পারব। বর্জ্য থেকে বিদ্যুত্, গ্যাস উত্পাদনের জন্য বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ফলের মৌসুমে রাজধানীর অলি-গলিতে বর্জ্য পড়ে আছে। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা রাতে দোকান বন্ধ করার পর বর্জ্যগুলো যত্রতত্র ফেলে যান। কাঁচাবাজারের অবস্থা আরো খারাপ। যত্রতত্র ময়লা ফেলা হয়। বৃষ্টিতে কাদা-পানির সঙ্গে বর্জ্য মিশে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে, রাস্তার যেখানে-সেখানে নির্মাণসামগ্রীর বর্জ্য তো আছেই। অনেক স্থানে ফুটপাতজুড়ে ইট-বালু-পাথর রাখা হয়। যানবাহন বা মানুষের চলাচলে সেগুলো আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। নগরের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বিশেষ অংশ বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত। ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে বর্জ্যশ্রমিক রয়েছে প্রায় দুই লাখ। অন্যদিকে, ক্ষতিকর জেনেও অতিদরিদ্র মানুষ বর্জ্যের মধ্যে খুঁজে বেড়ায় প্লাস্টিক, হাড় ও চামড়াজাত বস্তু। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে বর্জ্য শ্রমিকরা।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় পরিবেশ দূষণের কারণে। এছাড়া, বিশ্বের মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী শহরের তালিকায় রাজধানী ঢাকার অন্তর্ভুক্তির পেছনেও এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং পরিবেশ দূষণের দায় রয়েছে।
