শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গল্প

টিনএজের খেয়াল

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭:১০

অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ সেলফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা রিসিভ করতে যাব অমনি কলটা কেটে গেল। ফোনটা রেখে আবার কাজে মনোযোগ দিলাম। আবার ফোনটা বেজে উঠল। ধরতে যাব তখন আবারও কলটা কেটে গেল। অচেনা মিসকল ব্যাক করার সময় নাই। কিন্তু আধাঘণ্টা পরে আবার একই নাম্বার থেকে কল। এবার বিরক্ত হয়ে আমি নিজেই কলটা কেটে দিলাম।

কাজ শেষে অফিসের নিচে চা খেতে নামলাম, ফোনটা আবার বেজে উঠল। কিন্তু যথারীতি মিসকল। ফোনটা হাতে নিয়ে ঐ নাম্বারে ফোন করলাম। একবার রিং হওয়ামাত্র ফোনটি রিসিভ করল।

হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এলো ‘আই লাভ ইউ’। কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলো অল্পবয়সি একটা মেয়ে। আমি কী উত্তর দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। এর মধ্যে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে আবার বলল, আমি আপনাকে ভালোবাসি।

অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, তুমি আমাকে কেন ভালোবাস?

মেয়েটি বলল, আপনাকে আমার ভালো লাগে তাই ভালোবাসি।

—তুমি কি আমাকে কখনো দেখেছ? আর তুমি আমার ফোন নাম্বারটাইবা কোথায় পেলে?

—না আমি আপনাকে কখনো দেখিনি। আমার এক বান্ধবী আপনার নাম্বারটা দিয়েছে।

—তুমি কোন ক্লাসে পড়।

—ক্লাস নাইনে পড়ি।

—তুমি আমাকে কখনো দেখনি। তুমি আমাকে চেন না। তাহলে কীভাবে তুমি আমাকে ভালোবাস? ভালোবাসা তো হয় একজন আরেকজনকে দেখে।

—আমি আপনাকে না দেখেই ভালোবেসে ফেলেছি। আপনাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি। প্লিজ আপনি আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। আই লাভ ইউ—আমি আপনাকে আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। আপনি আমার কাছে যা চান তাই দেব তবুও আমার ভালোবাসাকে ফিরিয়ে দেবেন না প্লিজ প্লিজ...।

আমি একটু রাগান্বিত হয়ে বললাম, এই মেয়ে ফোন রাখ।

—না না প্লিজ আপনি ফোন রাখবেন না। তাহলে কিন্তু আমি আত্মহত্যা করব এবং আত্মহত্যার জন্য আপনাকে দায়ী করে চিঠি লিখে যাব।

মনে মনে ভাবছি এ কোন মহা ঝামেলায় পড়লাম আমি। হঠাত্ মাথায় একটা বুদ্ধি এলো—আপাতত মেয়েটাকে থামাই তারপর দেখা যাবে কী হয়। মেয়েটিকে বললাম—ঠিক আছে, এখন আমার হাতে কাজ আছে পরে তোমার সঙ্গে কথা বলব।

মেয়েটি বলল, ‘আপনাকে ফোন করতে হবে না আমিই আপনাকে ফোন করব। আই লাভ ইউ আমার জান।’

আপাতত হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হলাম। রাতের খাবার শেষে বউয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। বিছানায় যখন শুতে যাব ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। ফোন নাম্বারটা দেখে মেজাজটা বিগড়ে গেল। লাইনটা কেটে দিলাম। আবার কল করল। লাইনটা আবারো কেটে দিলাম। স্ত্রী বলল, কী ব্যাপার ফোনটা কেটে দিচ্ছ কেন?

স্ত্রীকে বললাম, তোমাকে এ ব্যাপারে পরে বলব। পরের দিন অফিসে ঢুকতে না ঢুকতেই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। হ্যালো বলার আগেই মেয়েটি বলে উঠল—আই লাভ ইউ, গুড মর্নিং। কেমন আছ আমার জান?...মেয়েটি কথা বলেই যাচ্ছে। অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা পানি খাচ্ছি এবং মেয়েটির কথা শুনছি। মেয়েটি কীসব কথা বলছে, শুনতে আর ভালো লাগছিল না। মেজাজটা এতোটাই বিগড়ে গেল—খুব জোরেই একটা ধমক দিয়ে বসলাম। মেয়েটি বলল, তুমি কি আমার উপর বেশি রেগে আছ।

—তুমি আমাকে তুমি তুমি করে কথা বলছ কেন। তুমি জানো আমি তোমার থেকে বয়সে কত বড়!

—বাহ্ ভালোবাসার মানুষকে তুমি বলব নাকি আপনি করে বলব!

—আমি তোমার বাবার বয়সি, জানো। তোমার বাবার নাম কী, তোমার বাসা কোথায়, বাসার ঠিকানাটা দাও তো। তোমাদের বাসায় যাব আমি। বেয়াদবির একটা শিক্ষা দিতে হবে তোমাকে।

হঠাত্ করে ফোনের লাইনটা কেটে দিল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম মনে মনে। এভাবে সপ্তাহখানেক কেটে গেল। কাজের চাপটা কম থাকায় একটু ফ্রিই ছিলাম। আবার সেই অচেনা কল। কলটা রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বলে বসল, আপনার মন-শরীর ভালো আছে?

মেয়েটির কণ্ঠস্বর কেমন যেন মনে হলো। মেয়েটি কিন্তু এবার তুমি সম্বোধন করেনি। জিগ্যেস করলাম, তুমি কেমন আছ? তোমার শরীর ভালো আছে তো? তোমার কণ্ঠস্বর কেমন যেন মনে হচ্ছে? এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজনের কণ্ঠস্বর পেলাম। আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, আপনি মেয়েটির কে হন?

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, আমি ওর মা। আপনি কি একটু হাসপাতালে আসতে পারবেন?

—হাসপাতালে কেন? কোন হাসপাতালে?

মেয়েটির মা হাসপাতাল ও কেবিনের নাম বললেন। হাসপাতালে গিয়ে নির্ধারিত কেবিন-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় টোকা দিলাম। মেয়েটি বিছানায় শুয়ে আছে অন্যদিকে মুখ করে। আমাকে দেখে মেয়েটির মা আমার হাত ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন, আমার মেয়েকে আপনি বাঁচান। ও আমাদের অনেক আদরের একমাত্র মেয়ে। মেয়েটি একবার যা ভাববে তা করেই ছাড়বে। কয়েকদিন আগে আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর থেকে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়। আমরা মনে করেছিলাম, হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করেছে। পরে ঠিক হয়ে যাবে কিন্তু একদিন সকালে ঘুম থেকে ডাকতে গেলাম দেখি উঠছে না। শরীরটা একেবারে নেতিয়ে গেছে। ভয় পেয়ে ওর বাবাকে ডাকলাম। আমরা দু’জনে ভীষণ ভয় পেলাম, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখলেন, ঘুমের বড়ি খেয়েছে অনেকগুলো। একটু সুস্থ হওয়ার পর আমরা ওকে জিগ্যেস করলাম, কী কারণে তুমি এমনটা করলে। তখন আপনার নাম্বারটা আমাদের দিল।

মেয়েটির বাবা বললেন, আমরাই আপনাকে ফোন করতে পারতাম। কিন্তু ওকে দিয়ে ফোন করালাম। এটার একটা কারণ আছে। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো আপনার বয়স কম। আমাদের ফোন পেয়ে ভয়ে নাও আসতে পারেন। কিন্তু ফোনের কণ্ঠস্বর শুনে আমাদের ধারণা পালটে গেল। তখন মেয়ের কাছ থেকে ফোনটা নিয়ে ওর মা আপনার সঙ্গে কথা বলেছে। আমরা সত্যিই লজ্জিত।

—লজ্জার কিছু নেই। আপনাদের মেয়ে এখন সুস্থ আছে এটাই আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া।

কিছুক্ষণ পর বেডে মেয়েটির মাথার কাছে বসলাম। মেয়েটি আমার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। বললাম, আমার সঙ্গে তোমার ভালোবাসার সম্পর্ক হতে পারে? এখন বলো তুমি কি আমাকে আর ভালোবাস?

মেয়েটি বলল, না।

আমি বললাম, আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসি। মেয়েকে ভালোবাসব না কাকে ভালোবাসব, বলো! বাবা-মেয়ের ভালোবাসার সম্পর্ক কোনোদিন শেষ হয় না। তুমি আমার কাছে সারা জীবন মেয়ে হয়েই থাকবে। আই লাভ ইউ মাই ডটার।

মেয়েটি মায়াভরা চোখে আমার দিকে তাকাল।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন