বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়াতে মনোযোগী রাশিয়া

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:০৪

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার তেলজাত পণ্য রপ্তানি এবং তেল উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছে মস্কো। এ কারণে খুব সম্ভবত তাদেরকে আরো বেশি অপরিশোধিত তেল রপ্তানিতেই মনোযোগ দিতে হবে। বিষয়টি সম্বন্ধে ব্যাপকভাবে অবগত রাশিয়ার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ কথা বলেছেন। ইউক্রেনে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেনা পাঠানোর পর থেকে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মস্কোকে ঘায়েল করতে চাইছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত বছরের ৫ ডিসেম্বর থেকে সমুদ্রপথে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি নিষিদ্ধ করেছে; আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা রাশিয়ার তেলজাত পণ্য আমদানিও নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। সৌদি আরবের পর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়ার ওপর এমন নিষেধাজ্ঞাকে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবেই দেখছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এ কারণে ইউরোপের বদলে এশিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকায় নিজেদের বাজার প্রসারিত করারও তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাশিয়ান ঐ কর্মকর্তা বলেন, তেলজাত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা অপরিশোধিত তেলের ওপর দেওয়া বিধিনিষেধের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে। এ রুশ কর্মকর্তা আরো জানান, নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদেরকে এখন আরো বেশি অপরিশোধিত তেল সরবরাহে নামতে হবে। তেলজাত পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার সক্ষমতা নেই রাশিয়ার।

অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি তেলজাত পণ্যের চেয়ে সহজ। তেলজাত পণ্য সরবরাহে ছোট ট্যাংকার হলেও চলে, বিক্রি করতে হয় কাছাকাছি অঞ্চলে। অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল এশিয়া, আমেরিকার দূরদূরান্তেও পাঠানো যায়।

মস্কোভিত্তিক ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান বিসিএসের রন স্মিথ বলেন, আমাদের ধারণা, পরিশোধিত পণ্যের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা অপরিশোধিত তেলের ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে, কেননা সমপরিমাণ অপরিশোধিত তেলের তুলনায় তেলজাত পণ্য রপ্তানি বেশ জটিল। আমাদের অনুমান, দুই নিষেধাজ্ঞা মিলিতভাবে রাশিয়ার তেল উৎপাদন কমাবে এবং রপ্তানিও সম্ভবত ২০২৩ সালের প্রথম প্রান্তিকের শেষ নাগাদ প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল কমিয়ে আনবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন ঐ রুশ কর্মকর্তা বলেছেন, চলতি বছর তাদের তেলজাত পণ্যের রপ্তানি ১৫ শতাংশের মতো কমতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়ার তেলজাত পণ্যের উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে ২৭ কোটি ২০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছিল, এ বছর তা কমে ২৩ কোটি টন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য চাওয়া হলেও রাশিয়ার জ্বালানি মন্ত্রণালয় তাতে সাড়া দেয়নি বলে জানা গেছে। পশ্চিমারা এবার রাশিয়ার তেলে যে ধরনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, স্নায়ু যুদ্ধের সময়ও এমনটা দেখা যায়নি। তা সত্ত্বেও পশ্চিম সাইবেরিয়াকেন্দ্রিক রাশিয়ার তেল উৎপাদন এখন পর্যন্ত ঐ নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বাজারে দাপট ধরে রেখেছে। ২০২২ সালে তারা অপরিশোধিত তেলের উৎপাদনও বাড়িয়েছে। শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট জি৭, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের ২৭টি দেশ গত ৫ ডিসেম্বর থেকে মূল্যসীমার ওপর থাকা বিধিনিষেধ মেনে ৬০ ডলারের ওপর রুশ অপরিশোধিত তেল কিনছে না। অবশ্য রাশিয়ার তেল এরচেয়ে কম দামেই বাজারে বিকোচ্ছে।

জি৭, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে রাশিয়ার পরিশোধিত জ্বালানি যেমন :ডিজেল, কেরোসিন ও অন্যান্য জ্বালনি তেলের ওপর একই রকমভাবে মূল্যসীমা বেঁধে দেওয়ার ছক কষছে। এর প্রতিক্রিয়ায় পুতিনও রাশিয়ার তেল উৎপাদকদেরকে তাদের সরবরাহ ইউরোপ থেকে সরিয়ে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো অন্য বাজারে নিয়ে যেতে তাগিদ দিয়েছেন। তার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক কয়েক দিন আগেই বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা এবং মূল্যসীমা বেঁধে দেওয়ার পরও রাশিয়ার উৎপাদকদের তেল বিক্রির অর্ডার (ক্রয়াদেশ) পেতে তেমন কোনো সমস্যা পোহাতে হচ্ছে না। এর অন্যতম প্রধান কারণ, চীন ও ভারত রুশ তেল কেনার পরিমাণ বহু গুণ বাড়িয়েছে। তবে তাদের মূল সমস্যা হচ্ছে—আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্কগুলোর উচ্চ ছাড় এবং নৌযানের খরচ বেড়ে যাওয়া, বলেছেন নোভাক।

রাশিয়ার ঊর্ধ্বতন ঐ কর্মকর্তা বলেন, নতুন সরবরাহ চেইন দাঁড় করিয়ে বছরের দ্বিতীয় ভাগ থেকে তেলজাত পণ্য রপ্তানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারার ব্যাপারে তারা আশাবাদী। রাশিয়ার তেল উৎপাদন ২০২২ সালে ৫৩ কোটি ৫০ লাখ টনের বদলে এ বছর ৪৯ কোটি টনে (প্রতিদিন ৯৮ লাখ ব্যারেল) নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২২ সালে মস্কো প্রতিদিন গড়ে ১২ লাখ ব্যারেল তেলজাত পণ্য রপ্তানি করেছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি। 

গত ১১ জানুয়ারি সংবাদমাধ্যম ভেদোমোস্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বিষয়ে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়, রাশিয়ার তেল উৎপাদন ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারির ১-৯ তারিখের মধ্যে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারির শুরুর দিকে রাশিয়ার তেল রপ্তানির পরিমাণ ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং পরিশোধিত পণ্যের পরিমাণ এক দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে বলেও জানিয়েছে ভেদোমোস্তি। রাশিয়ার চারটি বড় তেল শোধনাগার সংশ্লিষ্ট সূত্রও জানিয়েছে, তাদের ফেব্রুয়ারির উৎপাদন পরিকল্পনায় এখন পর্যন্ত কোনো পরিবর্তনই আনা হয়নি।

ইত্তেফাক/ইআ