বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

আগামী নির্বাচনে সরকার দলীয় পরিচয় ভুলে যাবে: সিইসি

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৩০

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, কিছু বিষয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য থাকার কারণে নির্বাচনি পরিবেশটা এখনো অনুকূলে (কনজেনিয়াল) নয়। তবে অচিরেই এই মতপার্থক্যটা দূর হয়ে যাবে বলে আমার প্রত্যাশা। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।  

বৈঠকে ইইউ প্রতিনিধিদলকে লিখিত বক্তব্যে সিইসি বলেন, বর্তমান সরকার একটি রাজনৈতিক সরকার। আমরা চাই আগামী সংসদ নির্বাচনে সরকার তার দলীয় পরিচয় ভুলে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের জন্য সব প্রয়োজনীয় সহায়তাও করবে। কিছু রাজনৈতিক দলের দাবি—আগামী সাধারণ নির্বাচন একধরনের অরাজনৈতিক কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে। তবে এটি একটি রাজনৈতিক বিষয়। এছাড়া নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি বলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে জানান তিনি। আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাম্বাসেডর চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ইইউ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাতে চায়। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে ইতিবাচক।

বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে শুরু হওয়া বৈঠকটি চলে দেড় ঘণ্টাব্যাপী। আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশভুক্ত ১১ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করে ইসি। এতে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল, নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর ও নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তবে ঢাকার বাইরে থাকায় নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান ও রাশেদা সুলতানা এ বৈঠকে অংশ নেননি। এছাড়া ইসি সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাম্বাসেডর চার্লস হোয়াইটলিসহ ১১ জন প্রতিনিধি ছিলেন। যার নেতৃত্বে ছিলেন হোয়াইটলি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাম্বাসেডর চার্লস হোয়াইটলি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। বৈঠকে আরো যেসব দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন—ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব মিশন ব্রেন্ড স্পাইনার, ডেনমার্কের অ্যাম্বাসেডর ইউনি স্ট্র্যাপ পিটারসন, সুইডেনের অ্যাম্বাসেডর এলেক্সান্ডরা বার্গ বন, জার্মানির অ্যাম্বাসেডর আচিম টোস্টার, নেদারল্যান্ডসের অ্যাম্বাসেডর এন্যি গিরার্ড ভ্যান লুইন, ফ্রান্সের ডেপুটি হেড অব মিশন গিলিয়াম এড্রেন ডে কের্ডেল, ইতালির ডেপুটি হেড অব মিশন মাটিয়া ভেনচুরা, স্পেনের হেড অব মিশন ইগনাসিয়ো সাইলস ফার্নান্দেজ, সুইজারল্যান্ডের অ্যাম্বাসেডর নাথালি চুয়ার্ড, নরওয়ের অ্যাম্বাসেডর এস্পেন রিক্টার সেভেন্ডসেন।

বৈঠকে লিখিত বক্তব্যে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ অবশ্যই সামনে রয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে বা আগামী বছরের জানুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন। যেহেতু প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন-সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো একমত নয়। সামগ্রিক পরিবেশ এখনো খুব অনুকূল নয়। তিনি বলেন, এছাড়া নির্বাচন কমিশনকে আইন ও সংবিধান দ্বারা প্রদত্ত ক্ষমতা আছে। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে আমরা কোনো ধরনের ছাড় দেব না।

সিইসি তার বক্তব্যে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা আন্তরিকভাবে তাগিদ দিচ্ছি সব আসনে প্রার্থী দাঁড় করানো এবং শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, নির্বাচন হওয়া উচিত অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক।

বৈঠক শেষে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমাদের যে রোডম্যাপ আছে, সে রোডম্যাপ অনুযায়ী আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে এবং আমরা যথাসময়ে নির্বাচন করব। আমরা এটাও উনাদেরকে পরিষ্কার করে বলেছি। কিছু কিছু বিষয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য থাকার কারণে এখনো নির্বাচনি পরিবেশটা অনুকূলে (কনজেনিয়াল) নয়। অচিরেই মতপার্থক্যটা দূর হয়ে যাবে আশা প্রকাশ করে সিইসি বলেন, শেষমেশ সব দল নির্বাচনে আসবে সে বিষয়ে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছি। আমরা বলেছি যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয় তাহলে চমৎকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সেই লক্ষ্যে আমাদের পুরো প্রস্তুতি রয়েছে।

পলিটিক্যাল ডায়লগের বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে একাধিকবার বলেছি যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন এবং ব্যাপক অর্থে তাদের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন, যাতে নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশে সম্পন্ন হয়। প্রথম থেকেই আমরা এই আবেদন করে আসছি, এখনো করে যাচ্ছি। মতপার্থক্যগুলো রাজনৈতিক ইস্যু, আমাদের জন্য ইস্যু নয়। কাজেই রাজনৈতিক ইস্যুগুলো, যেগুলো নির্বাচনের জন্য অন্তরায় হতে পারে, সেগুলোর সুরাহা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সেটা অনুধাবন করতে হবে এবং বুঝতে হবে। তাদেরই এই অসুখ নিরাময় করতে হবে। তাহলেই নির্বাচনটা প্রত্যাশিত মাত্রায় অংশগ্রহণমূলক হবে। সুন্দর, সুষ্ঠু হবে এবং গণতান্ত্রিক চেতনায় যে নির্বাচন প্রত্যাশিত, সে নির্বাচনটা ওভাবেই অনুষ্ঠিত হবে।

ইইউ প্রতিনিধিদল ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন উল্লেখ করে সিইসি বলেন, ‘ইভিএম নিয়ে যে অবিশ্বাস ছিল তা অনেকটা কেটে গিয়েছিল। তবে, এটাও জানিয়েছি যে ইভিএম নিয়ে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছি না, কারণ আদৌ ইভিএম এভেইলেবল হবে কি না। আমরা কী পরিমাণ নির্বাচন ইভিএমে করতে পারব, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হইনি। উনাদের সঙ্গে আমাদের এতটুকুই আলোচনা ছিল। আমার মনে হয় যেহেতু উনারা আসছেন উনারাই ভালো করে বলতে পারবেন।’

প্রতিনিধিদলের পক্ষে থেকে কোনো সুপারিশ আছে কি না জানতে চাইলে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘উনারা জানতে চেয়েছেন, আমরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণটা কী ধরনের সহযোগিতা দিতে পারব। আমরা বলেছি, গণমাধ্যম আমাদের নির্বাচন কভার করে থাকে, পর্যবেক্ষকরাও করে থাকে। অতীতেও যেভাবে করেছে কিন্তু এবার আমরা যেটা করব, আমাদের তরফ থেকে আমরা ফুললি ওপেন হব। আমাদের তরফ থেকে কোনো অন্তরায় থাকবে না। ফরেন অবজারভার সম্পর্কে আমাদের একটা পলিসি আছে। তারা আমাদের কাছে আবেদন করবেন। আমরা সেটা পাঠিয়ে দেব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এবং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। কারণ বিষয়টি দ্বিপাক্ষিকভাবে সুরাহা হতে হবে। কিন্তু এতটুকু আমরা বলেছি, আমাদের তরফ থেকে কোনো অন্তরায় থাকবে না।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রতিনিধি পাঠাতে আগ্রহী ইইউ :ডেলিগেশন অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন টু বাংলাদেশের হেড অব ডেলিগেশন চার্লস হোয়াইটলি বলেছেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে প্রতিনিধি পাঠাতে আগ্রহী ইইউ। অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সবাই চায়। এখানেই সবার আগ্রহ আছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ইইউ মিশন থেকে নির্বাচন কমিশন পরিদর্শন করেছি। নির্বাচন নিয়ে আমাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে আমাদের একটি মিটিং হয়েছিল। সেখান থেকে এ প্রক্রিয়াটির উন্নতি হয়েছে।

 

ইত্তেফাক/ইআ