বৃহস্পতিবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৬ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজশাহীতে খেজুর গুড়ে ভেজাল

‘রস দিয়ে গুড় কম হয়, তাই চিনিসহ উপাদান মিশানো হয়’

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৩:৫৬

দেশজুড়ে বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের খেজুর গুড়ের চাহিদা রয়েছে। এ কারণে এ অঞ্চলে প্রায় সারা বছরই গুড়ের কারকানা সরব থাকে। সরব থাকে অসংখ্য ভেজাল গুড়ের কারখানাও। শীতে খেজুর গুড়ের চাহিদা বেশি থাকায় ‘ভেজাল খেজুর গুড়’ তৈরির সঙ্গে জড়িতরাও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠে। 
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এবারো শীতের শুরু থেকেই এ অঞ্চলের বাজারগুলোতে খেজুর গুড়ে ভরে গেছে। এসব খেজুর গুড় রস থেকে তৈরি হয় না। বাজারে পাওয়া বেশির ভাগ গুড়ই তৈরি হচ্ছে চিনির মিশ্রণে। বিষয়টি একেবারে ‘ওপের সিক্রেট’ হলেও এহেন অপকর্মের বিরুদ্ধে থানা পুলিশের তৎপরতা কম। তবে র্যা ব ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝে মধ্যে ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযান চালায়। জরিমানা ও ভেজাল গুড় ধ্বংসসহ জড়িতদের গ্রেপ্তার করে কারাগারেও পাঠায়। কিন্তু জড়িতরা জামিনে বেরিয়েই আবারও একই অপকর্ম শুরু করে। ফলে বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল গুড়ের কারবার।  

আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চল ২৫ লাখের মত খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহীতে আট লাখের বেশি, শুধু চারঘাট উপজেলাতেই প্রায় চার লাখ খেজুরের গাছ রয়েছে। বাঘা উপজেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। বাকি গাছ পুঠিয়া ও অন্য উপজেলায়। রাজশাহীর পুঠিয়া, বাঘা ও চারঘাট উপজেলায় প্রচুর খেজুর গুড় উৎপাদন হয়। গাছিরা মালিকের কাছ থেকে গাছ ইজারা নিয়ে রস নামায়। সেই রস ও চিনিসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি গুড় হাটে বিক্রি করে। এবার ১৩০ টাকা কেজি দামে পাইকারিতে গুড় বিক্রি হচ্ছে। পুরো মৌসুমে অন্তত ২০০ কোটি টাকার খেজুর গুড় বিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।

বাঘার মনিগ্রামের গাছি ওসমান আলী জানান, বাজারে গুড়ের চেয়ে চিনির দাম কম। তাই খেজুর রস জাল দেওয়ার সময় চিনিসহ অন্যান্য উপাদান মিশানো হয়। এতে গুড়ের উৎপাদন বাড়ে। শুধু রস জাল দিয়ে গুড় হয় কম। তিনি যদি খাঁটি খেজুর গুড় বাজারে নিয়ে যান, তার দাম বেশি পাবেন না। চিনি দেওয়া গুড়ের যে দাম, তার গুড়েরও একই দাম। শুধু এই কারণে অনেক গাছি ইচ্ছা থাকলেও খাঁটি গুড় বিক্রি করতে পারেন না।

এদিকে, ১৮ জানুয়ারি নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার ছয় প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার ৫০০ কেজি ভেজাল গুড় ও ৩৪ হাজার লিটার ভেজাল চিনির সিরাপ জব্দ করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র্যা ব। ওই ছয় প্রতিষ্ঠানের মালিকদের দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে। 

র্যা বের নাটোর ক্যাম্পের অধিনায়ক, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফরহাদ হোসেন জানান, ওইসব প্রতিষ্ঠানে চিনির সিরাপ, ফিটকারি, রংসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল গুড় তৈরি হচ্ছিল। পরে র্যা ব ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যৌথভাবে অভিযান চালায়। এসময় ভেজাল গুড় ও গুড় তৈরির উপকরণ ধ্বংস করা হয়।  

২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর নাটোরের লালপুরের চর জাজিরা গ্রামে র্যা ব ও ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভেজাল গুড়ের কারখানায় অভিযান চালিয়ে নাজিম গুড় ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী নাজিম উদ্দিনকে খাদ্যপণ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্য মিশ্রণের অপরাধে দুই লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এছাড়া দুই হাজার কেজি ভেজাল গুড়, ৫০ কেজি চুন, পাঁচ কেজি ফিটকিরি, ১০ কেজি ডালডা ধ্বংসসহ জব্দ ২৭ বস্তা (১ হাজার ৩৫০ কেজি) চিনি বাজারে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। 

১৭ অক্টোবর লালপুরের বালিতিতা ইসলামপুর এলাকার সাগর গুড় ভাণ্ডারে ভোক্তা অধিকার ও র্যা ব অভিযান চালিয়ে তিন হাজার কেজি ভেজাল গুড়, ২৮০ কেজি চিটা গুড়, গুড় তৈরিতে ব্যবহৃত হাইড্রোসালফেট, ডালডা, ফিটকিরি, চিটাগুড় ও টেক্সটাইল কেমিক্যাল জব্দ করা হয়। পরে কারখানার মালিক সাগর হোসেনকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নাটোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান তানভীর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এসময় সচেতনতার জন্য ওই এলাকায় লিফলেট বিতরণ করা হয়।  

ইত্তেফাক/আরএজে