পাঠাও-এর সাফল্য দেখেই নাইজেরিয়ায় ‘গোকাডা’ তৈরি করেন ফাহিম
>> মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী
আফ্রিকা মহাদেশের অনেক বড় বড় শহরে মোটরসাইকেল-ট্যাক্সি অনেকটা নিউ ইয়র্কের হলুদ ক্যাবের মতোই সুলভ। এরকমই একটি শহর নাইজেরিয়ার লাগোস। এখানে ‘গোকাডা’ নামক রাইড-শেয়ারিং অ্যাপটি তার বিস্তৃতির জন্য ৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘সিরিজ-এ’ বিনিয়োগ করেছে।
শুনতে জটিল মনে হচ্ছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক অ্যাপটি সম্পর্কে। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘উবার’ ও ‘পাঠাও’-এর কথা সবার জানা। গোকাডা এমনই একটি অ্যাপ। ২০১৮ সালে এটি যাত্রা শুরু করে, যার সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বাংলাদেশি তরুণ ফাহিম সালেহ। বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও-এরও সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। এ বছর তিনি গোকাডা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে এক হাজার ব্যবহারকারীকে অ্যাপ চালানোর প্রশিক্ষণ দিয়েছে, পাশাপাশি দশ লক্ষ রাইড সম্পন্ন করেছে।
১৯৮৬ সালে জন্ম ফাহিমের। বাবা সালেহ উদ্দিন চট্টগ্রামের আর মা নোয়াখালীর মানুষ। ইনফরমেশন সিস্টেম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেন্টলি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন ফাহিম। থাকেন নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে। একসময় চাকরি করে পরিবারের খরচ জোগাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে ফাহিমের বাবাকে। সেইদিন পার করে তরুণ ফাহিমই এখন অনেকগুলো আইটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। খুব অল্প বয়সে অর্জন করেছেন সাফল্য।
ওহাইওতে থাকাকালীন মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ফাহিম সালেহ কিশোর বয়সীদের জন্য টিন হ্যাংআউট ডটকম নামের একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেন। সেসময় সমবয়সী আরেক ডেভেলপারের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। দুজনে মিলে দুই বছরে আরো অনেকগুলো ওয়েবসাইট তৈরি করে প্রায় এক মিলিয়ন ডলার আয় করেন। ২০০৭ সালে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ফাহিম ঢাকায় হ্যাকহাউজ নামের একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখান থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কাজ চলছিল।
২০০৯ সালে ফাহিমের গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়। নিউ ইয়র্কে বসে থেকে চাকরি পাওয়া বেশ কঠিন মনে করছিলেন, কিন্তু অন্যকোথাও যেতে চাইছিলেন না। বোস্টনে একটা চাকরির অফার পেলেন, বললেন দুই সপ্তাহ পরে জানাবেন। এই দুই সপ্তাহে প্র্যাঙ্ক ডায়াল ডটকম নামের আরেকটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেলেন তিনি। কণ্ঠস্বরকে বদলে বন্ধুদের সঙ্গে রসিকতা করা বা মূলত মজা করার জন্যই অনেকে এটি ব্যবহার করতেন। সাইটটি অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ফাহিমকে আর চাকরি করতে যেতে হয়নি।
রাইড শেয়ারিং অ্যাপ পাঠাও-এর সিইও হুসেইন ইলিয়াসের তৈরি করা একটি সাইট ছিল ইজ টুমোরো হরতাল ডটকম। দেশে তখন বিশৃঙ্খলা, লাগাতার হরতাল। হরতালের তথ্য দিতে দিতে সাইটটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাইটে হ্যাকহাউজের বিজ্ঞাপন দিতে গিয়ে ইলিয়াসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় ফাহিমের। নতুন কিছু করার কথা ভাবছিলেন তাঁরা। এভাবেই পাঠাও-এর জন্ম। দ্রুত সাফল্য অর্জন করে এই অ্যাপ। পাঠাও-এর সাফল্য দেখেই নাইজেরিয়ায় গোকাডা তৈরি করেন ফাহিম সালেহ।
ফাহিম সালেহ বলেন, ‘সামনে অনেক পরিকল্পনা আছে। বাংলাদেশেও কাজ করব। বিনোদন মাধ্যমে কাজ করার ইচ্ছা আছে। তবে আপাতত গোকাডা নিয়ে ভাবছি। এটিকে পুরো নাইজেরিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের ড্রাইভারদের জন্য সেরা সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যেই এই নেটওয়ার্কটা গড়ে তুলতে চাই, যাতে করে তাঁরা সহজে আমাদের ছেড়ে অন্য প্ল্যাটফর্মে যাওয়ার কারণ না পান।’
ট্রাফিক জ্যাম বা ব্যস্ত সড়কের অন্য গাড়িঘোড়াকে পাশ কাটিয়ে সরুপথে যাওয়া যায় বলেই যাত্রীরা মোটরবাইক-যাত্রায় বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। তবে আফ্রিকায় রাইড-শেয়ারিং কোম্পানি চালানোর অন্যতম সমস্যা হলো সড়কের বিশৃঙ্খলা, যা কিনা প্রায়ই বিপজ্জনক মাত্রা ধারণ করে। এসব কারণে নিরাপত্তার অভাবের জন্য নাইজেরিয়ায় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ চালু অনেকদিন যাবত নিষিদ্ধ ছিল। গোকাডা এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে চালকদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। তাঁরা চালকদের যাত্রাপথ ভালোভাবে ঠিক করা, অ্যাপের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মোটরসাইকেলের মান রক্ষা করার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে; যা কিনা এতদিন পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার অনাধুনিক মোটর-ট্যাক্সির বাজারে দেখা যায়নি।
